মেহেরপুর প্রতিনিধি
দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে নয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে শাকিল হোসেন (২২) নামের এক যুবককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
রবিবার (২৪ মে) দুপুরে মেহেরপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের (শিশু সহিংসতা দমন আদালত) বিচারক মো. তাজুল ইসলাম এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম এত কম সময়ে সশরীরে ও ভার্চুয়ালি মাত্র তিনদিনে ১২ জন সাক্ষীর জবানবন্দীগ্রহণ ও জেরা করে আদালত এই রায় দিলেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাকিল হোসেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের আব্দাল হাসানের ছেলে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ২০২৫ সালের ১৬ জুন গাংনী উপজেলার একটি গ্রামের পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ওই শিশুটি তার বাবাকে বাড়ির পাশের আবাদি মাঠে খাবার দিতে যাচ্ছিল। পথে ওত পেতে থাকা শাকিল হোসেন শিশুটিকে ধারালো হাসুয়া দিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে পাশের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে।
ধর্ষণ শেষে শিশুটির চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ধর্ষক শাকিল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ভুক্তভোগী শিশুটি বাড়ি ফিরে পরিবারকে বিষয়টি জানালে গ্রামবাসী ধাওয়া করে ধর্ষককে আটকে পিটুনি দেয়।
খবর পেয়ে গাংনী থানা পুলিশ উত্তেজিত জনতার হাত থেকে শাকিলকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। এই ঘটনায় ওই দিনই শিশুটির বাবা ইছানুল হক বাদী হয়ে গাংনী থানায় মামলা করেন।
পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করে। এরপর আদালত মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বিচারিক ক্ষেত্রে ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করে।
মামলার ১২ জন সাক্ষীর মধ্যে কয়েকজনের সশরীরে এবং বাকিদের ভার্চুয়ালি ভিডিও কলের মাধ্যমে মাত্র তিনদিনে জবানবন্দী গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়।
সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মেডিকেল রিপোর্টের ভিত্তিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক আসামি শাকিল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিন লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। জরিমানার এই টাকা আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে আদালতের মাধ্যমে ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণাকালে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন ও আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মারুফ আহমেদ বিজনসহ বিপুলসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
এই রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত শাকিল হোসেনের আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।