রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ছিলেন শিক্ষক। সরকারি কলেজে ঢুকে অর্থনীতি পড়িয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কাজ করেছেন প্রশাসনেও। একসময় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এরপর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে এসে বিএনপির স্থানীয় নেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন তাই শুরু থেকেই শুধু একটি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা নয়; এর মধ্যে আছে ছাত্রজীবনের বামপন্থি রাজনীতি, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, মন্ত্রিত্ব, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে উঠে আসার দীর্ঘ পথ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) এই নেতাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। সংসদে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে বলা যেতে পারে, মির্জা ফখরুলই হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপ্রতি।
ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ছিলেন এবং পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। মির্জা ফখরুলের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ও বেশ পুরনো। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বাংলাদেশের রাজনীতির পরিচিত নেতা ছিলেন এবং একসময় জাতীয় সংসদের স্পিকারও ছিলেন।
ফখরুলের বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁওয়ে হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে ঢাকায় আসতে হয়। তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়েন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার শুরু। ষাটের দশকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হন। পরে ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্বও পান। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও যেতে হয়েছিল।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে ঢোকেননি। তার কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে আরও কয়েকটি সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়ান।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের সঙ্গেও তার কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির সচিব হিসেবে কাজ করেন। পরে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান। তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও অর্থনীতি পড়িয়েছেন। সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরেও কাজ করেছেন এবং ইউনেসকোর সঙ্গেও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চাকরি ছেড়ে পৌর রাজনীতিতে
১৯৮৬ সালে মির্জা ফখরুল সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৯৮৮ সালের পৌর নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং জয়ী হন।
এটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়। জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব পালন করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে তার অবস্থানও ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে।
এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এখান থেকেই বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার উত্থান শুরু।
সংসদে যেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জাতীয় সংসদে যেতে তাকে কয়েকটি নির্বাচনের ফলের অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও একই আসনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হারেন, যদিও এবার ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম।
শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মির্জা ফখরুল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর সেটিই ছিল তার জাতীয় সংসদে প্রবেশ।
মন্ত্রী হিসেবে দুই মন্ত্রণালয়ে
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি অংশ নেন। তবে এরপর বিএনপির রাজনীতিতে তার মূল ভূমিকা ক্রমেই সাংগঠনিক ও দলীয় নেতৃত্বের দিকে চলে যায়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এরপর ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। তিনি প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্বে ছিলেন।
২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই দায়িত্ব তিনি এখনো পালন করছেন।
এই সময়ের মধ্যে বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে ছিল। ফলে ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে বিরোধী দলের কর্মসূচি, নির্বাচন, আন্দোলন, গ্রেপ্তার এবং দলীয় সংকট মোকাবিলার মধ্য দিয়ে।
আন্দোলন, মামলা ও কারাবাস
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল দীর্ঘ সময় ধরে দলটির অন্যতম প্রধান মুখ। নির্বাচনি ব্যবস্থা, সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে বিএনপির আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের পাশাপাশি বগুড়া-৬ আসন থেকেও নির্বাচন করেন। ‘রাতের ভোট হিসেবে’ পরিচিতি পাওয়া সেই নির্বাচনে তাকে বগুড়া-৬ আসনে জয়ী এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে পরাজিত দেখানো হয়। বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর মির্জা ফখরুল গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সময়ও তিনি কারাগারে ছিলেন। তার ৭৬তম জন্মদিনও কারাগারে কেটেছিল।
ওই সময় বিএনপি ও দলটির নেতারা তার গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই সময়ের ঘটনাগুলো তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায় হয়ে ওঠে।
২০২৬: আবার সংসদে, এবার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে মির্জা ফখরুল আবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বড় ব্যবধানে জয়ী হন। জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হিসাবে তিনি দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী পেয়েছিলেন এক লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট।
নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বেও থাকেন।
এবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নতুন অধ্যায়টি শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের আগস্টে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। এর আগে কয়েক দিন ধরে তার নাম নিয়ে আলোচনা চলছিল। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হলে তাকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। ইতিমধ্যেই বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও দলের মহাসচিবের পদ থেকে তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না, সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের সামনে তেমন কোনো বাধা নেই।
বিএনপির রাজনীতিতে তার উত্থান এক লাফে হয়নি। একজন ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে সরকারি কর্মকর্তা, সেখান থেকে পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে মহাসচিব। কয়েক দশক ধরে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় রাজনীতি, সংসদ ও দলীয় সংগঠনের নানা ধাপ পেরিয়েই মির্জা ফখরুল আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।