সুবর্ণভূমি ডেস্ক
শেখ হাসিনার কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এ দেশে আছে বলে মনে করেন না প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। বিষয়টা নিয়ে শুধু আমার কথা বলছি না, আওয়ামী লীগেরও চারপাশে পরিচিত মানুষ আছেন তারাও মনে করেন যে উনার (শেখ হাসিনার) কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কেন্দ্রে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
জিওপলিটিক্যালি কোনো চাপ আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এখানে জিওপলিটিক্যালি কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। আমরা যে এতক্ষণ যাকে নিয়ে আলোচনা করছি একেবারে অপ্রাসঙ্গিক একজন মানুষ। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলেছি উনি কোনো প্রাসঙ্গিক কেউ নন।’
‘সুতরাং দেশে ফেরার যে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে এটাকে আমি কোনো চাপ বা কোনো প্রবলেমের কিছু বলে মনে করি না। আমরা তো চাইছি উনি ফিরে আসুন আমরা তো উনাকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি প্রত্যাবর্তন করার চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘এমন না যে, আমরা চাইছি উনি ওখানেই থাকুন, উনি এখন আসবেন বলে আমরা চাপে পড়ে গেছি, ব্যাপারটা তো এরকম না। শুধু ইন্টেরিম না, এই সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কনফার্ম করেছেন এই সরকারও ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছেন।
উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা এই কারণে ওয়েলকাম করি, কারণ আমরা জাস্টিস নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের এই রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে ফেলেছে বলে আমরা বিশ্বাস করি, তাকে আমরা জাস্টিস দিতে চাই।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘তার (শেখ হাসিনা) মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তিনি আসবেন। তাকে আমরা যদি প্রত্যর্পণ করে আনতে পারি, সেই চেষ্টাই করছি। আর উনি যদি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে আসেন, তাহলে আদালতে যাবেন, উনি মামলা ফেস করবেন।’
তিনি বলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে আমাদের চিফ প্রসিকিউটর জবাব দিয়েছেন এবং সোমবার আমি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। উনার আসার ব্যাপারে আমরা যেহেতু চেষ্টা করছি, উনি যদি আসেন, আমরা কিন্তু শুরু থেকেই বলছি আমরা তাকে স্বাগত জানাবো।’
জাহেদ উর রহমান আরো বলেন, ‘মামলার জন্য বিদেশি আইনজীবী আনারও স্কোপ আছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আইনজীবী তিনি নিয়ে আসতে পারেন।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘এই দেশের জনগণ চায় তিনি যে অপরাধ করেছেন, তার জন্য যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটা যেন বহাল থাকে। এ রায় কার্যকরও জনগণ দেখতে চায়। আর আদালতে যদি প্রমাণ করতে পারেন তিনি অপরাধী নন, আদালত যদি শেষ পর্যন্ত তাকে অন্য কোনো শাস্তি দেয় অথবা তাকে খালাস দেয়- জাস্টিস এভাবেই হতে হয়।’
এদিকে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যবর্তণের সম্ভাবনা আছে কি নেই, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
তার আগে একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার।
নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদেও সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন হয়। স্বাভাবিকভাবেই দেশের ভেতরে দলটির কার্যক্রম চালানো আইন অনুযায়ী সম্ভব নয়।
সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর মতে, ‘বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে’ ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই দেশের বাইরে।
এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় যেমন দলটির তৎপরতা চালানো সম্ভব নয়, একইসাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলা মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার দিকটি মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ বৈরী’ বলেই মনে করছেন তিনি।
‘দরকার সমঝোতার রাজনীতি’
গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণসহ নানা কারণে জনরোষের মুখে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা। প্রাণ বাঁচাতে সেসময় দেশ ছাড়তে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে।
দুই বছর পর এসে সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ফলে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে যে কথা বলেছেন, তার জোরালো ভিত্তি নেই বলে মনে করছেন অনেকে।
তারা বলছেন, এমন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক সমঝোতাই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার একমাত্র উপায়। কিন্তু তা করতে হলে যে উপায়ে দলটির নেতাকর্মীদের এগোতে হবে, তার একেবারে ভিন্ন দিকে তারা হাঁটছেন বলেই মত বিশ্লেষকদের।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি সরাসরি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে করেন অধ্যাপক সাব্বীর আহমেদ, যার একটি আওয়ামী লীগপন্থি আর অন্যটি আওয়ামী লীগবিরোধী।
‘পুরো এন্টি আওয়ামী লীগ গ্রুপটা আওয়ামী লীগকে ফেরত চায় না। এখন তাদেরকেতো আপনার চাওয়াইতে হবে। আপনি ফিরতে হলে তো এদের সাথে থাকতে হবে। তারা যদি আপনাকে দাঁড়াইতে না দেয়, তাহলে আপনি কীভাবে আসবেন? কীভাবে আপনি রাজনীতি করবেন?,’ বলছিলেন তিনি।
এছাড়া বাংলাদেশে দলটির ৩০ শতাংশ অনুগত সমর্থক আছে বলে ধরে নিলেও বাকি ৭০ শতাংশ তাদের বিরুদ্ধে আছে। ফলে ‘অস্তিত্ব সংকটে’ থাকায় সেই ৩০ শতাংশ এই মুহূর্তে একত্রিত হয়েও শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে পারার বাস্তবতা নেই বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আহমেদ।
‘যেতে হবে আইনি পন্থায়’
শেখ হাসিনার ফেরার পরিকল্পনা গণমাধ্যমে আসার পরপরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আমি মনে করি না এটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। এটা মূলত একটা প্রোপাগান্ডার অংশ।
এদিকে শেখ হাসিনা ‘আসছেন না, আসতে পারবেন না’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারাদেশে ৬৬৩টি মামলা হয়েছে। এরমধ্যে কেবল হত্যা মামলাই হয়েছে ৪৫৩টি, যার একটিতে তাকে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডাদেশ।
ফলে আইনত আওয়ামী লীগের এই নেতা দেশে ফেরা মাত্রই গ্রেপ্তার হবেন। যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলছেন, ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত। ভারত সরকার তাকে দিতে পারে, নাও দিতে পারে। সো উনি স্বাধীনভাবে এসে আত্মসমর্পণ করবেন, এটা আমার মনে হয় ঠিক না,’ বলেন তিনি।
যদিও আইনজ্ঞরা বলছেন, রায় হবার পর আপিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও শেখ হাসিনা যখনই বাংলাদেশে ফিরে আসেন না কেন আত্মসমর্পণ করে সাজার রায়ের বিরুদ্ধে তার আপিল করার সুযোগ আছে।