সম্পাদকীয়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের তেলক্ষেত্র গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ সাম্প্রতিক হুমকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা ও উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। একজন রাষ্ট্রনেতার পক্ষে এ ধরনের উগ্র ও ধ্বংসাত্মক বক্তব্য কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনই করে না, বরং আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
যুদ্ধের হুমকি দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনে একটি গুরুতর অপরাধ। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলে যে, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা তার হুমকি প্রদান থেকে বিরত থাকবে। ট্রাম্পের বক্তব্য এই নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। তাছাড়া জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুযায়ী, নিরীহ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি ও অবকাঠামো ধ্বংসের ডাক ‘আগ্রাসনের অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধ’-এর শামিল।
ট্রাম্পের ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি আধুনিক সভ্যতা ও মানবতার জন্য অকল্পনীয়। ইরানের সাধারণ নাগরিক, যাদের অধিকাংশই তরুণ ও শিক্ষিত, তাদের মৌলিক জীবনযাত্রার অধিকার, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, পানিসহ ন্যূনতম মানবিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা রয়েছে। একটি পুরো জাতিকে অনাহার, চিকিৎসাবিহীনতা ও শক্তিহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য।
মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সিনেটররা তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এটি একটি গুরুতর ইঙ্গিত যে, কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির মানসিক স্থিতিশীলতা ও রায়বিচার ক্ষমতা যখন সংশয়ের মুখে পড়ে, তখন বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মধ্যে থাকে। একজন প্রেসিডেন্টের মেজাজ, ক্ষোভ ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা যেন রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক চাপ জরুরি।
ট্রাম্পের এসব হুমকি প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে। ইরান পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে বেরিয়ে যাওয়া, সর্বোচ্চ চাপের নীতি, এখন হুমকির ভাষায় কথা বলা- এসব কিছুই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে। আলোচনা ও সংলাপের পরিবর্তে চরমপন্থী হুমকি আন্তর্জাতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে, যার ফল ভোগ করে গোটা বিশ্ব। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের, যাতে তারা এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়। যুদ্ধের হুমকি কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। ট্রাম্পকে এ বিষয়ে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের নীতিনির্ধারকদেরও ধৈর্য ও কূটনীতির পথে থাকার পরামর্শ দেওয়া যায়, যাতে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।
মনে রাখা দরকার, ক্ষমতা স্থায়ী নয়। প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সংযমে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধায় এবং মানবতার মূল্যবোধে। ট্রাম্পের হুমকি যতই উচ্চকিত হোক, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধ ততই আরও সুদৃঢ় ও প্রতিরোধী হয়ে উঠুক- এটাই প্রত্যাশা