যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

কোলকাতায় আগুন, নিহত নয়জনের মধ্যে সাংবাদিকসহ পাঁচ বাংলাদেশি

বিশেষ প্রতিনিধি

, যশোর

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট,২০২৬, ১২:০১ এ এম
কোলকাতায় আগুন, নিহত নয়জনের মধ্যে সাংবাদিকসহ পাঁচ বাংলাদেশি

ভারতের কোলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের আবাসিক হোটেল ‘শিখা ইন’ এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। বুধবার সকাল থেকে কোলকাতা পুলিশ, হাসপাতাল ও বাংলাদেশি সূত্রের মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ পর্যন্ত পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, তাদের তিন বছর বয়সী ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং আফসানার বাবা আকরাম হোসেন রয়েছেন। অপর শনাক্ত ব্যক্তি ঢাকার আমিনবাজারের আহমেদ বাবু।

অগ্নিকাণ্ডে একজন ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তিনি ঝাড়খণ্ডের গিরিডিহের ১৯ বছর বয়সী সন্দীপ পাসোয়ান। প্রায় তিন মাস আগে বাবার মৃত্যুর পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পেরে কোলকাতায় কাজের সন্ধানে আসেন এবং মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলটিতে রিসেপশনকর্মী হিসেবে যোগ দেন। আগুন লাগার সময় তিনি রিসেপশনে ছিলেন। উদ্ধারকারীরা তাকে ধোঁয়ায় অচেতন অবস্থায় বের করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, কোলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। সকল গণমাধ্যম অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের সংখ্যা পাঁচ উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের পরিচয়ও তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এক বিবৃতিতে পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু ও তাদের পরিচয় প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে, বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কোলকাতায় বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে অন্তত আটজন বাংলাদেশি বলে তারা জানতে পেরেছেন, যদিও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। যদিও প্রাথমিকভাবে হোটেল মালিক সমিতি জানিয়েছিল, নিহতদের সবাই বাংলাদেশি’।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবর অনুযায়ী হোটেলের চার তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। ওই খবরে বলা হচ্ছে এয়ার কন্ডিশনিং বিস্ফোরণের কারণে আগুনের শুরু হয়ে থাকতে পারে, তবে কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে প্রকাশ করা হয় খবরে।

বিবিসি বাংলার খবরে আরও বলা হয়েছে, ‘‘সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া, পিটিআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘন ধোঁয়ার কারণে শুরুতে দমকল কর্মীরা ভেতরে যেতে পারছিলো না।” নাম প্রকাশ না করে পিটিআইকে দেয়া ঐ বক্তব্যে পুলিশ কর্মকর্তা মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।’’

বিবিসি বাংলার অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘যোগনারায়ণ আগরওয়াল নামে শিলিগুড়ির বাসিন্দা এক ৬৮ বছরের প্রৌঢ়ও এই ঘটনায় মারা গিয়েছেন।’

সর্বশেষ প্রতিবেদনে স্থানীয় পুলিশ ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারে। দেবাশীষ দত্ত (৪০) কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এবং আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন।

অগ্নিকাণ্ডে তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪) নিহত হন। কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকায় তাদের বাড়ি।

পরিবারের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য তারা ভারতে গিয়েছিলেন। প্রথমে কোলকাতায় অবস্থানের পর স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু যান। চিকিৎসা শেষে সোমবার রাতে কোলকাতায় ফেরেন এবং পরদিন রাতে যে হোটেলে উঠেছিলেন, সেখানেই আগুনের ঘটনা ঘটে। দেশে ফেরার প্রস্তুতিও ছিল তাদের।

দেবাশীষের মৃত্যুর খবরে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্বজন ও সহকর্মীরা তার পরিবারের চার সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।

মঙ্গলবার দিবাগদ গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয় সময় রাত প্রায় ২টা ৫০ মিনিটে হোটেল ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। অন্য স্থানীয় প্রতিবেদনে আগুন লাগার সময় রাত ২টার কিছু পর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ভবনের ভেতরে ঘন ধোঁয়া তৈরি হয়।

ঘটনার সময় অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। ফলে আগুন ও ধোঁয়ার বিষয়টি বুঝতে এবং নিরাপদে বেরিয়ে আসতে অনেকেই সময় পাননি। দমকলকর্মীরা ওপরের তলায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সমস্যার মুখে পড়েন। ঘন কালো ধোঁয়া উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তোলে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আগুনের চেয়ে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়েই অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। আগুনটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে শুরু হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত নয়।

অগ্নিকাণ্ডের সময় হোটেলের কয়েকজন বাংলাদেশি অতিথি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। তাদের একজন মর্জিনা বেগম জানান, ঘন ধোঁয়ায় তারা শ্বাস নিতে পারছিলেন না এবং চারদিকে বাঁচার জন্য মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, একপর্যায়ে স্থানীয়রা জানালা ভেঙে তাদের বের করে আনার চেষ্টা করেন। অন্য এক বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি কোহিনুর আক্তার জানান, আগুন ও ধোঁয়ার কারণে সিঁড়ি দেখা যাচ্ছিল না এবং লিফটও ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। তারা ওপরের তলায় আটকা পড়েছিলেন।

কোহিনুরের ভাষ্য অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জানালা খুলে দেন, যাতে কিছুটা বাতাস ঢুকতে পারে। পরে আরেক ব্যক্তি টর্চলাইট নিয়ে তাদের পথ দেখান। সেই টর্চের আলো অনুসরণ করে তারা ছাদে উঠতে সক্ষম হন। দীর্ঘ সময় ছাদে অবস্থানের পর দমকলকর্মীরা তাদের উদ্ধার করেন।

কোলকাতার এই ভবনে একাধিক আবাসিক হোটেল ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর উদ্ধারকারী দল ভবন ও আশপাশের হোটেলগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বের করে আনে। পশ্চিমবঙ্গের দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় ৮০ জনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে পাঁচটি ফায়ার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরাও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। আহতদের কাছাকাছি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশি আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোলকাতার গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে আরও ছয়জন আহত হয়েছিলেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

নিহত ও আহত বাংলাদেশিরা মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে। কোলকাতার নিউ মার্কেট, মির্জা গালিব স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকা বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রত্যাশী ও পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত। এ এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য কম বাজেটের বহু হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

দেবাশীষ দত্তের পরিবারের ক্ষেত্রেও চিকিৎসাই ছিল ভারত যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য। প্রথমে কোলকাতায় অবস্থানের পর তারা বেঙ্গালুরু যান এবং চিকিৎসা শেষে কোলকাতায় ফেরেন। এরপর দেশে ফেরার আগের রাতেই তাদের মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে।

ঘটনার পর হোটেল ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ভবনটি ঘনবসতিপূর্ণ ও সরু সড়কঘেরা এলাকায় হওয়ায় আগুন লাগার পর উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে পড়ে। ঘন ধোঁয়া, সরু পথ এবং ওপরের তলায় আটকে পড়া অতিথিদের কারণে উদ্ধারকারীদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, জরুরি নির্গমনপথ কতটা কার্যকর ছিল এবং ভবনটি অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা মেনে পরিচালিত হচ্ছিল কি না-এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল কর্তৃপক্ষ আগুনের কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি খতিয়ে দেখছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এই দল আগুনের কারণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করবে।

নিহতদের মরদেহ হাসপাতাল ও পুলিশ মর্গে নেওয়া হয়েছে। পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়াও চলছে। নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বাংলাদেশের কোলকাতাস্থিত উপহাইকমিশনও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। মরদেহ দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে কনস্যুলার ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সেবার তালিকায় মৃতদেহ দেশে ফেরত নেওয়ার জন্য পৃথক এনওসি-সংক্রান্ত সেবাও রয়েছে।

এদিকে নিহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা ও জাতীয়তার তথ্যও আরও স্পষ্ট হবে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যার পরিবর্তে পুলিশ, হাসপাতাল ও বাংলাদেশি কূটনৈতিক সূত্রের চূড়ান্ত তথ্যকেই পরবর্তী সময়ে ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে।

কোলকাতার এই অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের চার সদস্যসহ বাংলাদেশিদের মৃত্যুতে দুই দেশের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিচালিত আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)