সুবর্ণভূমি ডেস্ক
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সংঘাতের দিকে নতুন করে ফিরে না যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা কমেনি।
পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও দুই পক্ষের সামরিক বাহিনীর অবস্থান পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বর্তমানে ইরানি বাহিনীর আঘাত হানার দূরত্বের মধ্যেই মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনী অবস্থান করছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরান এই যুদ্ধবিরতির সময়টিকে তাদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং নতুন করে সংগঠিত হতে ব্যবহার করছে। এই মুখোমুখি অবস্থান যেকোনো মুহূর্তে ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক চাপ বজায় রেখে ছাড় আদায়ের চেষ্টা করলেও ইরান বিন্দুমাত্র পিছু হটতে রাজি নয়। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা মার্কিন ঘাঁটি ও আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোয় পাল্টা আঘাত হানবে।
দুই দেশের মধ্যে একটি ‘সহযোগিতা স্মারক’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথ খোঁজা হলেও তা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বৈরুতে ইসরাইলের নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করার ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিকল্পগুলোকে আরও সীমিত করে দিয়েছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতির বিরোধী হওয়ায় মার্কিন-ইরান চুক্তি এখন আরও জটিলতার মুখে পড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি হামলার পর ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে এই ব্যস্ত সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির। এর ফলে বিশ্ববাজার তাদের স্বাভাবিক তেল ও গ্যাসের সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হারিয়েছে।
যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল পাঠাচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল না হলেও, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রোলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে।
সহজ বিজয়ের আশায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন বিমান হামলার মাধ্যমেই ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা সম্ভব, যা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ মোকাবিলা করে টিকে থাকা ইরানকে তারা মারাত্মকভাবে কম মূল্যায়ন করেছিলেন। ট্রাম্পের জন্য এখন এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ নেই। দেশের ভেতরেও এই যুদ্ধ অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরান যেসব শর্ত দিচ্ছে, তা মেনে নেওয়া ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানের কট্টরপন্থি এবং তার নিজের রাজনৈতিক ইমেজের কারণে সম্ভব হচ্ছে না।
চলমান এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী আরব রাষ্ট্রগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক মডেলে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে এই অঞ্চলের যে সুনাম ছিল, তা এখন সংকটে।
কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তান ও কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও আমিরাত ও সৌদি আরব ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে সেখানে আয়রন ডোম ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালালেও তেহরানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে, মার্কিন-ইসরাইল জোটের অংশ হিসেবে নয়। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের খেসারত এখন বাকি বিশ্বকেও দিতে হচ্ছে।