সম্পাদকীয়
‘বর্জ্য’ শব্দটি শুনলে আমাদের মনে ভেসে ওঠে ঘৃণা আর অবহেলা। বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা কচুরিপানা, সবজির উচ্ছিষ্ট, গোবর, মুরগির বিষ্ঠা বা নিমপাতা- এগুলো সাধারণ চোখে নেহাতই আবর্জনা। কিন্তু যশোরের চৌগাছার তরুণ উদ্যোক্তা ইমরান হোসেন প্রমাণ করেছেন, এই ‘আবর্জনাই’ হতে পারে সম্ভাবনার উৎস, জীবিকার পথ ও অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি।
ইমরানের গল্প শুধু একটি ব্যবসা সফল হওয়ার কাহিনি নয়; এটি আমাদের বিকল্প চিন্তার, সাহসী সিদ্ধান্তের এবং টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একসময় যে তরুণ ২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির বন্দী জীবন ছেড়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন অনিশ্চয়তার মাঝে, তিনি আজ নিজের দুই শতক জমিতে গড়ে তুলেছেন প্রায় ২০ লাখ টাকার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। তিনি শুধু নিজে আত্মনির্ভর হননি, বরং অন্যদেরও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছেন।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো এর পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিক উপযোগিতা। ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন প্রক্রিয়া যেমন কৃষিজ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করে, তেমনি এটি মাটির জন্য অত্যন্ত উপকারী। রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাংলাদেশের মাটি আজ উর্বরতা হারাচ্ছে, জৈব পদার্থের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাইকো কম্পোস্ট একটি কার্যকর সমাধান। এটি যেমন মাটির স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনে, তেমনি কৃষকের উৎপাদন খরচও কমায়। ইমরানের উৎপাদিত সার ও লিচেট ইতোমধ্যে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহের কৃষকদের কাছে পৌঁছে গেছে; যা প্রমাণ করে, জৈব সারের চাহিদা ও সম্ভাবনা উভয়ই বিপুল।
ইমরানের সাফল্য আমাদের তরুণ সমাজকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আজও লাখ লাখ তরুণ চাকরির পেছনে ছুটছেন, অথচ তাদের হাতের নাগালেই রয়েছে সম্ভাবনার হাতছানি। ইমরান তার অভিজ্ঞতা, যদি চাকরির পেছনে ছোটার দরকার নেই। সবকিছু হিসাব-নিকাশ করে উদ্যোক্তা হতে পারলে সফলতা আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তার পথ অনুসরণ করে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন- এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।
তবে ইমরানের মতো উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়াতে প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা। কৃষি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, সহজ শর্তে ঋণ, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসনে পারে। ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন যেমন রাসায়নিক সারের আমদানিনির্ভরতা কমায়, তেমনি এটি বাড়ির আঙিনায় অল্প পুঁজিতেই শুরু করা সম্ভব। ফলে এমন একটি খাতকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ইমরানের দুই শতক জমির উদ্যোগটি হয়তো বিশাল নয়, কিন্তু এটি সম্ভাবনার দ্বার খুলতে একটি দিকনির্দেশনা। পাশাপাশি এই উদ্যোগ আরেকটি শিক্ষাও দেয়। তা হলো, আবর্জনার মধ্যেও সম্পদ লুকিয়ে থাকতে পারে; যথাযথ চিন্তা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে আমরা তা কাজে লাগালে বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা যদি নীতিগত সহায়তা ও সমাজের স্বীকৃতি পায়, তাহলে একদিন এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের একটি শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই যাত্রায় ইমরান যেন একা না হয়ে পড়েন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে দাঁড়াতে হবে ইমরানদের মতো উদ্যোক্তাদের পেছনে।