যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোরকে মৎস্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র গড়ার আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ১৬ আগস্ট,২০২৬, ০১:১৭ পিএম
যশোরকে মৎস্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র গড়ার আহ্বান

‘রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যশোরে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ এর উদ্বোধন করা হয়েছে। মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরা, নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদনে জনসচেতনতা সৃষ্টি, দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ এবং মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এ পক্ষ পালন করা হচ্ছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) সকালে জেলা প্রশাসন ও জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন করেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন খান খোকন। উদ্বোধনের পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে যশোর শিল্পকলা একাডেমি পর্যন্ত বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। এতে মৎস্যচাষি, হ্যাচারি মালিক, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পরে যশোর পৌর পার্কের পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়।

পরে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকারের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন খান খোকন বলেন, একসময় যশোরে মৎস্যচাষে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল, তা ধরে রেখে এ খাতকে আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। মৎস্যচাষিদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে সরকারি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে আরও বেশি তদারকি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করাই নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব হলো এসব কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করা।

মৎস্যচাষিদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে খোকন বলেন, বিদ্যুৎসহ কিছু সমস্যা জাতীয় পর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, যশোর ইতোমধ্যে ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একইভাবে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে জেলাটিকে দেশের অন্যতম প্রধান মৎস্য উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য মৎস্যচাষিদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, সরকারি দপ্তরের কার্যকর তদারকি এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে মাছের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি এ দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে মৎস্যসম্পদের গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।

তিনি বলেন, মৎস্য উৎপাদনে সরকারি দপ্তর ও চাষিদের নিরন্তর প্রচেষ্টা থাকলেও বাজারে মাছের দাম ও সহজলভ্যতা নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য মাছ সহজলভ্য করার বিষয়েও নজর দিতে হবে।

মোহাম্মদ আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, যশোর ফুলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যশোরকে মৎস্যের রাজধানী হিসেবেও পরিচিত করা সম্ভব। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা ও মৎস্যচাষিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, সরাসরি মৎস্যচাষিদের কাছে গিয়ে তাদের সুবিধা-অসুবিধা ও সমস্যাগুলো জানতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা এসব তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, মৎস্য খাতকে শক্তিশালী শিল্পে পরিণত করে বিদেশে রপ্তানি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মৎস্য খাতকে যশোরের অন্যতম প্রধান শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ ও মানসম্মত মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জলাশয় ও দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত। এ খাতে নারীদেরও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে।

মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের মাছের প্রাপ্যতাও বেড়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক মাছের প্রাপ্যতা ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম। জাতীয় পুষ্টিচাহিদা অনুযায়ী মাথাপিছু দৈনিক মাছের প্রয়োজন ৬০ গ্রাম। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বর্তমানে মাছের প্রাপ্যতা বেশি বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

বক্তারা বলেন, দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষা, জলাশয়ের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকার বন্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জেলে ও মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে বিকল্প কর্মসংস্থান ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক আশেক হাসান যশোরে একটি আধুনিক মৎস্য পরীক্ষাগার স্থাপনের আশ্বাস দেন। নিরাপদ মাছ উৎপাদন এবং মাছের গুণগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষায় যশোরের বিভিন্ন জলাশয়ে অভয়াশ্রম গড়ে তোলার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় ও দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যতে অনেক প্রজাতি হারিয়ে যেতে পারে। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মৎস্যসম্পদের টেকসই সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, মৎস্য খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চিংড়ির একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশের সুপারশপগুলোতে মানসম্মত চিংড়ি সরবরাহ সহজ করার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য জলাশয় উন্মুক্ত করার উদ্যোগের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্বাদু পানি উপকেন্দ্র, যশোরের প্রধান ডা. এএসএম তানভিরুল হক। এছাড়া জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুর রহমান গোলদার, সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দিন চৌধুরী, জেলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান মিঠু, পোনা ব্যবসায়ী আল-আমীন মৃধা, পুরস্কারপ্রাপ্ত চাষিদের পক্ষে মেসার্স সরদার মৎস্য খামারের স্বত্বাধিকারী মহিরুল ইসলাম এবং বুকভরা বাওড়ের কোষাধ্যক্ষ মৎস্যচাষি অশোক রায় বক্তব্য দেন।

আলোচনা সভা শেষে মৎস্য খাতে বিশেষ অবদান রাখায় মৎস্যচাষি ও হ্যাচারি মালিকদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে আয়োজিত র‌্যালিতে মাতৃ ফিস হ্যাচারি, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন, ফাহাদ হ্যাচারি ও মৎস্য খামার, যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতি, আকলিমা মৎস্য খামার, মেসার্স রীতা মৎস্য খামার, প্রবীর মৎস্য হ্যাচারি, বিসমিল্লাহ ফিস হ্যাচারি, মুক্তেশ্বরী ফিস হ্যাচারি, চৌধুরী মৎস্য হ্যাচারি, পিয়াংকা মৎস্য হ্যাচারি, আনান ফিস হ্যাচারি, উবাইদুর মৎস্য হ্যাচারি, মধুমতি মৎস্য হ্যাচারি এবং হামজা মৎস্য হ্যাচারি ও খামারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)