স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
‘প্রতি মুহূর্তে ধর্মের গল্প না দিয়ে ইসলামকে যদি চরিত্রে ধারণ করি, হৃদয়ে ধারণ করি, তাহলে বলবো ধৈর্য ধারণ করুন। সাড়ে চার বছর পর চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের কাছে দাঁড়ান, আমরাও দাঁড়া। জনগণকে দেওয়া ওয়াদা আমরা কতটুকু পালন করতে পেরেছি আর কোথায় ব্যর্থ হয়েছি, সেটি জনগণের কাছেই তুলে ধরা হবে। সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশের মানুষ।’
কথাগুলো বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জ্বালানি, খনিজ ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপির।
শনিবার বিকেলে যশোর শহরের চৌরাস্তায় ‘গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে’ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত গণসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিহত ৬৮ সহযোদ্ধাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, যারা শেখ হাসিনার পতনে জীবন দিয়েছেন, তাদের সেই দৃশ্য দেখার কথা ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তারা তা দেখে যেতে পারেননি। যারা বেঁচে আছেন, তারা সৌভাগ্যবান। কারণ তারা নতুন বাংলাদেশ গঠনের সুযোগ পেয়েছেন। তাই এই অর্জনের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর গণতন্ত্রবিহীন পরিস্থিতিতে থাকার পর জনগণ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে বর্তমান সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে। মানুষ আর অপেক্ষা করতে চায় না। কারণ ফ্যাসিবাদী শাসনের দীর্ঘ সময় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মিলিয়ে তারা বহু বছর অপেক্ষা করেছে। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তবে, সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জনগণ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী তারেক রহমানকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দেশ পুনর্গঠনে তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। সরকারের প্রতিটি ব্যস্ততা দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এবং প্রতিটি পরিবারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জন্য।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আমরা জিয়াউর রহমানের আদর্শের সৈনিক। আমরা বিশ্বাস করি, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নয়, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই আমরা রাজনীতি করি।
তিনি বলেন, যার কাছে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থই সবচেয়ে বড়, তার জন্য রাজনীতি নয়। প্রকৃত রাজনীতি হচ্ছে নিজের কষ্ট মেনে নিয়েও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
যশোরের রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় নিহত বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, শহীদ অবদার ফারুক, আব্দুল খালেক, খলিল চেয়ারম্যান, কোহিনূর, আনোয়ারুল, প্রবীর হোসেন পলাশ, নাজমুল ইসলাম, আবু বক্কর আবু, লুৎফর ও রফিকসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।
সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন তিনি বলেন, প্রতিটি অসচ্ছল পরিবারের নারী প্রধানের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া এবং যশোরে পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট চালু করা সরকারের অঙ্গীকার। যাতে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা খুলনায় নিতে গিয়ে আর জীবন হারাতে না হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, যশোরে আন্দোলনের সময় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে থেকে আন্দোলন শক্তিশালী করেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও সেই ভূমিকা স্বীকার করেছেন। নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই তারা রাজপথে ছিলেন এবং শেখ হাসিনার পতন নিশ্চিত করার সংকল্পে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে এক ধরনের বক্তব্য আর বাইরে আরেক ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন। প্রতি মুহূর্তে ধর্মের গল্প না দিয়ে ইসলামকে যদি চরিত্রে ধারণ করি, হৃদয়ে ধারণ করি, তাহলে ধৈর্য ধারণ করুন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর জনগণই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করবে। সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দেবে, তা মাথা পেতে নেওয়া হবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার ধারণ করে এবং বাস্তবায়নের কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশই ইতোমধ্যে আইনে পরিণত হয়েছে। যেগুলো এখনো হয়নি, সেগুলো আরও যাচাই-বাছাই করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে আইন করা হবে।
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ সার্ভিস কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাড়াহুড়া নয়, সব রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে স্থায়ী ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে চায় বিএনপি।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকদের দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সুদের সমপরিমাণ অর্থ মওকুফ করা হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। যশোরে ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে এবং দ্রুত পূর্ণাঙ্গ করোনারি কেয়ার ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমাবেশের শেষদিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও আয়োজন সফল করায় আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তফা আমীর ফয়সালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম। প্রধান বক্তা ছিলেন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস এম জিলানী।
এছাড়া, যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা সরদার নুরুজ্জামানসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রাজেদুর রহমান সাগর।