মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল
হজ ও কুরবানির মাস জিলহজ। ইসলামি শরিয়তে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ মাস এটি। হিজরি বর্ষের সর্বশেষ মাস এটি। রমজান মাসের পর সবচেয়ে বড় ইবাদতের মৌসুম এই জিলহজ মাস। কুরআনে কারিমের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে চার মাসকে সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন জিলহজ তার অন্যতম।
এ মাসের ফজিলতপূর্ণ দিবসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আশারায়ে জিলহজ’ তথা জিলহজের প্রথম দশক। কুরআন মাজিদের সুরা ফাজরে আল্লাহ তাআলা যে দশ রজনীর শপথ করেছেন, সেই ‘দশ’ হলো জিলহজের এই প্রথম দশক। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., হজরত ইবনে জুবাইর রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ পূর্ববর্তী-পরবর্তী অনেক মুফাসসির এ মতই ব্যক্ত করেছেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা ফাজর-এর তাফসির দ্রষ্টব্য)
জিলহজের প্রথম দশকের করণীয় আমলসমূহ নিম্নরূপ:
১. নেক আমল ও জিকির বৃদ্ধি করা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দশকের ব্যাপারে ইরশাদ করেন, আল্লাহর নিকট জিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৮; সহিহ বুখারি: ৯৬৯; জামে তিরমিজি: ৭৫৭)
হাদিসে এসেছে-
আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে জিলহজের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদু লিল্লাহ’ পাঠ করো। (মুসনাদে আহমাদ: ৫৪৪৬)
২. রোজা রাখা: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন। বর্ণিত হয়েছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজের নয়টি দিবসে (সাধারণত) রোজা রাখতেন। (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৭)
নবী করীম (সা.)-এর কোনো স্ত্রী থেকে বর্ণিত যে, ‘রাসুলুল্লাহ্ (সা.) জিলহজ মাসের নয় দিন, আশুরার দিন এবং প্রত্যেক মাসের তিন দিন, মাসের দুই সোমবার এবং বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করতেন।’ (নাসায়ি শরিফ: ২৪১৭)
সুতরাং বুঝা গেল জিলহজের প্রথম নয় দিনের রোজা রাখা সুন্নাত।
৩. হাজিদের সাদৃশ্য অবলম্বন: এ দশকের একটি বিশেষ আমল হলো জিলহজের চাঁদ ওঠা থেকে নিয়ে কুরবানি করা পর্যন্ত নখ-চুল না কাটা, না ছাটা। এতে একদিকে হাজি ছাহেবানের সাথে একরকম সাদৃশ্য প্রকাশ পায়। পাশাপাশি এর রয়েছে বিশেষ ফজিলতও। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন জিলহজের চাঁদ দেখবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানি করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। (সহিহ মুসলিম: ১৯৭৭)
অতএব জিলহজ আগমনের পূর্বেই নখ-চুল কেটে ছেটে পরিপাটি হয়ে থাকা বাঞ্ছনীয়। যারা কুরবানি করবেন তারা তো এ মুস্তাহাবের প্রতি যত্নবান হবেনই। আর অন্যান্য বর্ণনার নিরিখে এ-ও বুঝে আসে যে, যারা কুরবানি করবেন না, তারাও ফজিলতপূর্ণ এ আমলে শরিক হতে পারেন। এমনকি বাচ্চাদেরকেও অভিভাবকরা চুল-নখ কাটা থেকে বিরত রাখতে পারেন। এতেও ইনশাআল্লাহ সাওয়াব হাছিল হবে। (সুনানে আবু দাউদ: ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ি: ৪৩৬৫)
৪. আরাফার দিন তথা নয় জিলহজের রোজা: বিশেষ করে নয় তারিখ ‘ইয়াওমে আরাফা’কে বিশেষ গুরুত্বের সাথে আমলে নেওয়া চাই। এদিন অতিবাহিত করি দুআ-দরুদ, কান্নাকাটি এবং তাওবা-ইস্তিগফারে। ইহতিমাম করি এ দিনে রোজা রাখার প্রতি। স্মরণ রাখি নবীজির হাদিসে এসেছে, ‘আরাফার দিনের (নয় জিলহজের) রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি, তিনি পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
আরাফার দিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তের শেষ দিকে বিদায় হজের সময় আরাফার দিন শুক্রবার আল্লাহ তাআলা ইসলামকে পরিপূর্ণ দ্বীন হিসাবে ঘোষণা করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।’ (মায়েদাহ: ৫/৩)
আরাফার দিনের ফজিলত প্রসঙ্গে নবী সা. বলেন, ‘এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদেরকে আরাফার দিনের চেয়ে জাহান্নাম থেকে বেশি মুক্তি দিয়ে থাকেন। তিনি সেদিন বান্দাদের খুব নিকটবর্তী হন, তাদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করে বলেন, এরা কী চায়?’ (অর্থাৎ তারা যা চায়, আমি তাই দেবো)। (ইবনে মাজাহ: ৩০১৪)
৫. হজ ও কুরবানি: জিলহজ মাস হচ্ছে হজ ও কুরবানি আদায়ের মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাদেরকে এ নেক আমল আদায়ের তাওফিক দিয়েছেন গুরুত্বের সাথে তারা ইবাদত দুটি পালনের প্রতি যত্নবান হই এবং ইখলাসের সাথে তা করতে চেষ্টা করি। শয়তান বহুভাবে বান্দার আমলের রুহ নষ্ট করে দেওয়ার পাঁয়তারায় থাকে। কোনোভাবেই তাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য কীভাবে আমার আমলগুলো নিবেদিত হতে পারে সেদিকে পূর্ণ মনোযোগী হওয়া দরকার। কীভাবে হজ ও কুরবানি আমার ইমানি জিন্দেগিতে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি। কোনোভাবে যেন কষ্টের আমলগুলো বিনষ্ট না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকি। আল্লাহই একমাত্র তাওকিকদাতা।
৬. তাকবিরে তাশরিক পাঠ: জিলহজ মাসের নয় তারিখ ফজর থেকে নিয়ে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। তাকবিরে তাশরিক হলো, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
সর্বমোট পাঁচ দিন তাকবিরে তাশরিক বলা হলেও পরিভাষায় সাধারণত ১১, ১২ বা ১৩ জিলহজকে আইয়ামে তাশরিক বলা হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আইয়ামে তাশরিক হলো পানাহার ও আল্লাহর জিকিরের জন্য। (মুসনাদে আহমাদ: ২০৭২২; সহিহ মুসলিম: ১১৪১)
অতএব আমরা এ দিনগুলোতে জিকির ও তাকবির পাঠের খুব ইহতিমাম করবো।
হাদিসে বলা হয়েছে, এ দিনগুলো পানাহারের দিন (সহিহ মুসলিম: ১১৪১)। সহিহ মুসলিমে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে ‘আইয়ামে তাশরিকে রোজা রাখা হারাম’ অধ্যায়ে। এ হিসাবে জিলহজের দশ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখা হারাম।
কুরবানি হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য। তবে আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে বান্দার জন্য কুরবানির পশুর গোশত খাওয়া হালাল করে দিয়েছেন; একে নির্ধারণ করেছেন বান্দার আপ্যায়ন হিসাবে। তাই আইয়ামে তাশরিকে রোযা রাখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, এ যেন সেই মেহমানদারি কবুল করার অপূর্ব সুযোগ! আবদ ও মাবুদের পারস্পরিক প্রেম ও ভালোবাসা এবং মুমিন-অন্তরের গভীরে ইমানি অনুভূতিই কেবল অনুভব করতে পারে সেই আপ্যায়নের স্বর্গীয় স্বাদ!
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে জিলহজের গুরুত্ব অনুধাবন করে ইবাদতে ইবাদতে তা ফলপ্রসূ করার তাওফিক নসিব করুন। আমাদের আসলাফ ও বুজুর্গগণ এ ব্যাপারে খুব যত্নবান ছিলেন। হজরত সাইদ ইবনে জুবাইর রাহ. জিলহজের এ দিনগুলোতে ইবাদত বাড়িয়ে দিতেন। তিনি বলতেন, এ রাতগুলোতে তোমরা ঘরের বাতি বন্ধ করো না। অর্থাৎ রাত্রি জাগরণ করে আমলে মশগুল থাকো। তিনি আরো বলতেন, তোমরা ঘরের খাদেমদেরও আরাফার দিবসে রোজা রাখার জন্য সাহরি খেতে তুলে দাও। (হিলইয়াতুল আউলিয়া: ৪/২৮১; তাহজিবুল আছার, তবারি, বর্ণনা ৬০৮)
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকেও জিলহজ মাসের প্রথম দশকের ইবাদতের মৌসুমকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দড়াটানা মাদরাসা, যশোর