সুবর্ণভূমি ডেস্ক
আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার চেয়ে দেশের বিচারপতিদের দায় আরো বেশি ছিল। তার ভাষায়, বিচার বিভাগই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যার ওপর ভর করে দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতি, চাটুকারিতা এবং ক্ষমতার সঙ্গে অবস্থান বদলে ফেলার প্রবণতাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শনিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার চেয়ে যদি কারো বেশি অপরাধ থাকে, তাহলে বিচারপতিদের অপরাধ তার থেকেও বেশি। আপনারাই সেই মাঠ তৈরি করেছেন, যার ফলে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
তিনি বলেন, কেন বিচারপতিরা এমন ভূমিকা নিয়েছিলেন, তারও একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। সেটি হলো বাংলাদেশের ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে।
বিচার বিভাগের সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে মানুষের চরিত্র বদলে যায়। যদি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হতো এবং তিন মাস বিচার বিভাগ বা হাইকোর্ট না থাকত, তাতেও দেশের তেমন ক্ষতি হতো না।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় কয়েক দিন পুলিশ না থাকার প্রসঙ্গ টেনে বলেনচার দিন পুলিশ না থাকলেও দেশে আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ অবনতি হয়নি। অথচ নিউ ইয়র্কে চার দিন পুলিশ না থাকলে কেউ নিরাপদে থাকতে পারত না। এতে প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষকে যতই খারাপ বলা হোক না কেন, তারা যথেষ্ট সভ্য।’
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘কুষ্টিয়ায় আদালত চত্বরে আমার ওপর হামলার সময় বিচার বিভাগ কিংবা সুশীল সমাজের কাছ থেকে কোনো প্রতিবাদ পাইনি। আমার বিরুদ্ধে ১২৫টি মামলা থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলায় হাজিরা দিতে হতো। তিনি বলেন, এসব মামলা একত্র করে ঢাকায় স্থানান্তরের আবেদন করা হলেও কোনো বিচারপতি তা গ্রহণ করেননি।
তিনি আরও বলেন, হামলায় আহত হওয়ার পরদিনও সুনামগঞ্জে আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। না গেলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আশঙ্কা ছিল। এ অবস্থায় হাইকোর্টে আগাম জামিন চাইতে গেলে একজন বিচারপতি তাকে বলেন, ‘আপনার চেহারা দেখতে আমাদের ভালো লাগে না। আপনি আর কখনো হাইকোর্টে আসবেন না।’
মাহমুদুর রহমান বলেন, একজন বিচারপতির মুখে এমন ভাষা উচ্চারণই প্রমাণ করে বিচার বিভাগ কী অবস্থায় ছিল। তার দাবি, এসব কারণেই দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
আমার দেশ সম্পাদক বলেন, ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতির কারণে রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিরাও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ইঙ্গিত করে বলেন, একজন রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পায়ের ধুলা আর নিতে পারবেন না বলে তার দুঃখ হচ্ছে।
তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, যিনি শেখ হাসিনার পায়ের ধুলা নিতে পেরেছেন, তিনি চাইলে তারেক রহমানের পায়ের ধুলাও নিতে পারতেন, তাহলে হয়তো পদত্যাগ করতে হতো না। এ ধরনের মানসিকতাকেই তিনি রাষ্ট্র ধ্বংসের অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ খারাপ নয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চাটুকারিতা ও ব্যক্তি পূজার সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। তিনি দাবি করেন, এ কারণে তিনি অনেকের অপছন্দের ব্যক্তি, কারণ তিনি সব সময় অপ্রিয় সত্য কথা বলেন।
নিজের ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে মাহমুদুর রহমান বলেন, তিনি নিজেও একজন ভুক্তভোগী। ব্যক্তিগত বিষয় সাধারণত প্রকাশ করেন না, তবে প্রসঙ্গক্রমে তা বলতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন আর কখনো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং অন্যদেরও সত্য তথ্য নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এতে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা হবে।
বিএনপির সঙ্গে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনসভায় গেলে ‘আমার দেশ’-এর একটি কপি সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং বক্তব্যের সময় সংবাদ উদ্ধৃত করতেন। তখন সরকারপক্ষ ‘আমার দেশ’কে বিএনপির পত্রিকা বলে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করত।
তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে যখন অনেকেই নীরব ছিলেন, তখন ‘আমার দেশ’ প্রথম বলেছিল এটি ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। পরবর্তী সময়ে সেটিই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এখনো ‘আমার দেশ’ ভুক্তভোগীদের কথা তুলে ধরেছে। তিনি দাবি করেন, আটজন ভুক্তভোগীর কাহিনি ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও অন্য কোনো সংবাদপত্র তা প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রকে অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রিত বলে মন্তব্য করে মাহমুদুর রহমান বলেন, তাদের নানা স্বার্থ থাকায় তারা ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে পারে না। কিন্তু ‘আমার দেশ’-এর কোনো ব্যাবসায়িক স্বার্থ নেই, তাই তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যে বিএনপি একসময় ‘আমার দেশ’কে নিজেদের ঘনিষ্ঠ পত্রিকা হিসেবে দেখত, এখন ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলই ‘আমার দেশ’কে জামায়াতের পত্রিকা বলছে। কারণ, সরকারকে তোষামোদ বা চাটুকারিতা না করলেই এ ধরনের তকমা দেওয়া হয়। তার মতে, ক্ষমতায় গেলেই সবাই প্রশংসা শুনতে চায়—এটাই বাংলাদেশের জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে এবং এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘নেভার এগেইন’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, যাতে আর কখনো গণহত্যা না ঘটে। কিন্তু আজ যাদের জন্য সেই অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তারাই অন্যদের ওপর একই ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে। তিনি দাবি করেন, হিটলারের জার্মানি ও বর্তমান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
বাংলাদেশে যেন আর কোনো ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে, সে জন্য তিনটি বিষয়কে জরুরি বলে উল্লেখ করেন মাহমুদুর রহমান। প্রথমত, অপরাধীদের দল-মতনির্বিশেষে সবার বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার আশা না করে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সরকারকে যুক্তিসংগত ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বর্তমান সরকারকে মনে রাখতে হবে যে তারাও দীর্ঘ ১৭ বছর ভুক্তভোগী ছিলেন; তাই তারা যেন নতুন করে অত্যাচারীতে পরিণত না হন।
বক্তব্যের শেষ দিকে মাহমুদুর রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে একসময় ১২৫টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ৬৫টির নিষ্পত্তি হয়েছে, তবে এখনও প্রায় ৫০টি মামলা বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার চাইলে এসব মামলায় যেকোনো সময় তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে এবং সে জন্য তিনি প্রস্তুত আছেন।