সাইফুল ইসলাম কবির
, বাগেরহাট
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের রামপালে নির্মিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই বারবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা। দেশজুড়ে যখন তীব্র লোডশেডিং চলছে, তখন বিপুল বিনিয়োগ ও বিদেশি ঋণে নির্মিত একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বারবার ব্যাহত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং, অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত রামপাল কেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে না পারা-দুইয়ের সমন্বিত চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ খাতের ওপর। একই সঙ্গে কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হলেও সরকারের আর্থিক দায় কমছে না। ফলে রামপাল এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
১৬০ কোটি ডলারের ঋণ, সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটির মালিকানায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের এনটিপিসির অংশীদারিত্ব ৫০ শতাংশ করে।
চুক্তির আওতায় কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও নির্দিষ্ট হারে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের দায় রয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন কমে যাওয়া বা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও সরকারের আর্থিক দায় পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাতে না পারার পাশাপাশি আর্থিক চাপও বহাল থাকছে।
উৎপাদন বাড়লেও কাটছে না সংকট
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আট হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
তবে উৎপাদন বাড়লেও কেন্দ্রটির অর্থনৈতিক হিসাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে ১৪ টাকার বেশি, অথচ সরকার তা প্রায় ১১ টাকা দরে বিক্রি করছে। ফলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপও অব্যাহত থাকছে।
লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বারবার ব্যাহত উৎপাদন
দেশের বিভিন্ন এলাকায় যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, তখন রামপালের মতো বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন জাতীয় গ্রিডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি, জ্বালানি সংকট ও পরিচালনাগত নানা জটিলতার কারণে কেন্দ্রটির উৎপাদন বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি রামপাল কেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন কেন্দ্রটি প্রত্যাশিত মাত্রায় ধারাবাহিকভাবে চালানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ওই পর্যায়ে।
জাতীয় গ্রিডে বাড়ছে চাপ
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, কয়লা ও গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে। বেড়েছে লোডশেডিং।
এমন পরিস্থিতিতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারায় বিদ্যুৎ বিভাগের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির সময়ে বড় কেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা যেখানে জরুরি, সেখানে রামপালের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
বিপুল বিনিয়োগের সুফল কতটা মিলছে?
প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, ১৬০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ, উৎপাদন ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি এবং ক্যাপাসিটি চার্জ-সব মিলিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে অর্থনৈতিক দায়ের পরিমাণ কম নয়। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে এবং এর বিপরীতে জনগণ কতটা সুফল পাচ্ছে-এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন বিদ্যুতের সংকট তীব্র, তখন বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র কেন বারবার উৎপাদন ব্যাহত করছে, তার স্থায়ী সমাধান কী-তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা বাড়ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও যদি উৎপাদন ব্যয়, ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ অব্যাহত থাকে এবং একই সঙ্গে কেন্দ্রের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা যোগ করেছে। কিন্তু সেই সক্ষমতা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজে লাগানো না গেলে কেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে লোডশেডিংয়ের সময়ে কেন্দ্রটির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন বড় প্রশ্ন-রামপাল কেন্দ্রের বারবার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণগুলো কীভাবে স্থায়ীভাবে দূর করা যাবে, কীভাবে এর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হবে এবং বিপুল বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে। এসব প্রশ্নের কার্যকর সমাধানই এখন প্রত্যাশা করছেন বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা।