আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
সুরঞ্জন দাসের এখন নিজের আর কোনো জমি নেই। তিন বছর আগে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার শ্রীপতিপুর এলাকায় তার একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই এক শতক বসতভিটাও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। লক্ষ্য একটাই, মেজ ছেলে শুভ দাসকে (২৫) লেবাননে পাঠিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানো। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন চিতায় ভস্ম হওয়ার পথে।
গত সোমবার রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন শুভ।
বুধবার বিকেলে শ্রীপতিপুর গ্রামে সুরঞ্জনের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জরাজীর্ণ ঘরের দাওয়ায় বসে ডুকরে কাঁদছেন মা শিখা দাস। একটি ভ্যানের উপর বসে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বাবা সুরঞ্জন। তার পাশে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি শাহাদাত হোসেনসহ কয়েকজন প্রতিবেশী। বাড়িটি শোকাতুর। সবার চোখেমুখে একটাই আকুতি- ছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখা।
পেশায় ভ্যানচালক সুরঞ্জন দাস জানান, বাড়ি বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হয়নি। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠান। ভিটে হারিয়ে গত তিন বছর ধরে সপরিবারে এক হাজার টাকা ভাড়ার একটি বাসায় থাকছেন। প্রতি মাসে শুভ ৩৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়েই ঋণের কিস্তি শোধ আর ছোট দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা চলছিল।
বিলাপ করতে করতে মা শিখা রানী দাস বলেন, ‘সংসারের হাল ফেরাতে ছেলেটা বিয়েও করেনি। বলেছিল আরও কিছুদিন থেকে টাকা জমিয়ে বাড়ি ফিরে ঘর বাঁধবে। ভগবান কেন আমাদের কপাল পুড়িয়ে দিলো? এখন ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর আমার মানিককেই বা কই পাব?’
শুভর ছোট বোন সাধনা দাস কলারোয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। কান্নারত কণ্ঠে সে বলে, ‘রোববার রাতে দাদার সাথে শেষ কথা হয়েছিল। দুই মাস টাকা পাঠাতে পারেনি বলে খুব আফসোস করছিল। দাদা আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাতো। তাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু এখন আমরা থাকবো কোথায়?’
প্রতিবেশী সুমন দাস বলেন, শুভ খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে। এলাকার সবার সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। তার এই অকাল মৃত্যু পুরো গ্রামকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
শুভসহ গত দুই দিনে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাতক্ষীরার মোট তিনজন প্রবাসী নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এখন পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় ইউপি মেম্বর শাহাদাত হোসেন বলেন, সুরঞ্জন দাস এখন পরিবার নিয়ে থাকেন ধানের চাতালের ফেলে রাখা খুপড়ি ঘরে। চড়া সুদে এনজিও ও স্থানীয়দের কাছ থেকে টাকা নিয়ে শুভকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সেই শুভর মারা যাওয়ার খবরে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই অসহায় পরিবারটি যেন মাথা গোজার ঠাঁই পায়, সে ব্যাপারে সরকারের সহায়তা কামনা করেন তিনি।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শুভর পরিবার যাতে দ্রুত মরদেহ ফিরে পায়, সে জন্য আমরা কনস্যুলেট ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছি। একইসঙ্গে সরকারিভাবে সব ধরনের আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানিয়েছেন, প্রবাসীদের মরদেহ ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।