সম্পাদকীয়
যশোর শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি
ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত চেতনা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। একটি দেশের তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল পথে এগিয়ে নিতে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে যখন দেশের তরুণদের একটি বিরাট অংশ নেশার জগতে পা বাড়াচ্ছে, তখন খেলাধুলার গুরুত্ব স্বয়ং সরকারই বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে।
এই বাস্তবতায় যশোর সদরের হামিদপুরে গড়ে ওঠা শাম্স-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বেসরকারি উদ্যোগে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ফুটবল একাডেমি গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।
বুধবার সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আশাব্যঞ্জক। প্রায় ৭০ বিঘা জমির সুবিশাল সবুজ এলাকা, একাধিক প্রশিক্ষণ মাঠ, আধুনিক আবাসিক ভবন, জিমনেশিয়াম, লাইব্রেরি, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, স্টাডিরুম, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা—সব মিলিয়ে একজন তরুণ ফুটবলারের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির চেষ্টা এখানে রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে পাশের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে। অর্থাৎ, খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি মানুষ তৈরির একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একাডেমির সাফল্যের দিকটিও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের ক্যাম্পে একাডেমির খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ, দেশের প্রিমিয়ার লিগসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাদের উপস্থিতি এবং বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার ঘটনা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার ফল পাওয়া সম্ভব। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের মতো দেশের ফুটবল-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রশিক্ষণ বা অনুশীলনের সুযোগ পাওয়া তরুণদের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়ায়, তেমনি দেশের ফুটবলের সম্ভাবনাকেও সামনে আনে।
তবে একথাও বলে রাখা ভালো যে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য দিয়ে দেশের ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শাম্স-উল-হুদা একাডেমির অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় পর্যায়ে একটি টেকসই ফুটবল উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলার শিক্ষা নেওয়া দরকার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন একাডেমি গড়ে উঠলে প্রতিভা অন্বেষণ ও পরিচর্যার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, পুষ্টি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংগঠনগুলোরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দক্ষ কোচ, আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং খেলোয়াড়দের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ—সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে হবে। ফুটবলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেওয়া তরুণদের জন্য শামস-উল-হুদা একাডেমি শিক্ষার যে ব্যবস্থা রেখেছে, তাও খুবই বাস্তবসম্মত। সবাই উন্নতমানের খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে বিকশিত করতে পারবে না। যারা ব্যর্থ হবে তাদের যাতে পরবর্তী জীবনে অনিশ্চয়তার মুখে না পড়তে হয়, সে বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ সুদূরপ্রসারী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।
হামিদপুরের সবুজ মাঠে বৃষ্টির মধ্যেও তরুণদের ফুটবল অনুশীলনের যে দৃশ্য, তা আসলে একটি বৃহত্তর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। সেই স্বপ্ন কেবল কয়েকজন ভালো ফুটবলার তৈরির নয়; বরং একটি সুস্থ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম গড়ে তোলার। শাম্স-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির মতো উদ্যোগ যদি ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে, তবে এটি বাংলাদেশের ফুটবলে একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন এখন এই উদ্যোগের সাফল্যকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা।