সম্পাদকীয়
মাদক নিয়ন্ত্রণে ঝিনাইদহ জেলা পুলিশের ডোপ টেস্ট কার্যক্রম নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের কার্যক্রমে ২৩৫ জনের ডোপ টেস্ট করে ২২২ জনের মাদক সেবনের প্রমাণ পাওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে ১৭৫টি মামলা হওয়া থেকে বোঝা যায়, মাদকসেবন শনাক্তকরণে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাদকসেবন প্রমাণিত হওয়ার পর সংক্ষিপ্ত বিচারের আওতায় এনে দণ্ড দেওয়ার সুযোগ থাকায় আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াও দ্রুত হচ্ছে।
কিন্তু সফলতার এই চিত্রের আড়ালে যে সমস্যাটি সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। ডোপ টেস্টের জন্য সরকারি কোনো অর্থ বরাদ্দ না থাকায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিজেদের পকেট থেকে পরীক্ষার খরচ বহন করতে হচ্ছে। জনপ্রতি ৯০০ টাকা হিসেবে ২৩৫টি পরীক্ষার খরচ দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৫০০ টাকা। এই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে পুলিশ কর্মকর্তাদের বহন করার বিষয়টি কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কার্যক্রম ব্যক্তিগত অর্থের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। এতে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ পড়ে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে কার্যক্রমটি চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতোমধ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে সেই উদ্বেগ স্পষ্ট হয়েছে। পুলিশ সুপারও বলেছেন, অর্থের সংস্থান না হলে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে মামলা পরিচালনা না করে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। এতে মাদকবিরোধী অভিযানের একটি কার্যকর ও দ্রুততর দিক দুর্বল হয়ে পড়বে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডোপ টেস্টের কিট ও পরীক্ষার অবকাঠামো সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পরীক্ষা বাবদ নির্ধারিত অর্থও সরকারি রাজস্ব খাতে জমা হয়। তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে পরিচালিত একটি কার্যক্রমের ব্যয় কেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অর্থে বহন করতে হবে—এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সহযোগিতার আশ্বাস অবশ্যই ইতিবাচক। ‘আগামীর শৈলকুপা’ ইতোমধ্যে ৪২ হাজার টাকা দিয়েছে। জেলা পরিষদ, জোহান পার্ক ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অনুদান বা ব্যক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করে একটি সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা করা টেকসই সমাধান নয়। এতে অর্থের ধারাবাহিকতা যেমন নিশ্চিত হয় না, তেমনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সরকারের উচিত বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন কোনো জেলার সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। ডোপ টেস্টের জন্য প্রয়োজনীয় কিট, ল্যাব সুবিধা ও পরীক্ষার ব্যয় সরকারি বাজেট থেকে নিশ্চিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কোন ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট করা হবে, পরীক্ষার ফল কীভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা হবে এবং সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষেত্রে এর প্রমাণমূল্য কী—এসব বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
মাদক একটি সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকট। শুধু শাস্তি দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের সমন্বিত ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থায় ডোপ টেস্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হতে পারে। তবে হাতিয়ারটি কার্যকর রাখতে হলে এর ব্যয়ভারও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
ঝিনাইদহ পুলিশের উদ্যোগ তাই বন্ধ না হয়ে বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সহায়তায় আরও শক্তিশালী হোক—এটাই প্রত্যাশা। মাদক নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অর্থের ওপর নির্ভর না করে সরকারি অর্থায়নে একটি নিয়মতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও টেকসই ডোপ টেস্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।