সুবর্ণভূমি ডেস্ক
মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে দেশ বিজ্ঞান গবেষণা ও সৃজনশীলতা হারিয়ে চরম পরনির্ভরশীলতার দিকে যাচ্ছে। এর দায় শিক্ষার্থীদের নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেম ও নীতি-নির্ধারকদের ভাবনার অভাবই মূল কারণ। এ বিষয়ে খ্যাতনামা বিজ্ঞানী, লেখক ও গবেষক রউফুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে মন্তব্য প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।
একসময় বোর্ড স্ট্যান্ড করা স্টুডেন্টরাও ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে ফিজিক্স পড়তে চাইতো। এপ্লাইড কেমেস্ট্রি পড়তো। মলিকিউলার বায়োলজি পড়তো। সংখ্যায় কম হলেও পড়তো। একটা ধারা ছিলো।
বোর্ড স্ট্যান্ড করা অনেক কঠিন বিষয় ছিলো। আজকের দিনের এ-প্লাস পাওয়ার চেয়ে বহুগুণ কঠিন। প্রফেসর জাহিদ হাসান ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করা স্টুডেন্ট। চাইলেই মেডিক্যাল-বুয়েটে পড়তে পারতেন অনায়েসে। কিন্তু তিনি পড়তে চাইলেন ফিজিক্স। তাই পড়লেন। প্রফেসর সাইফ ইসলাম সারা বাংলাদেশে প্রথম হয়েছিলেন। এসএসসি এবং এইচসি'তে। চোখ বন্ধ করে মেডিক্যালে ভর্তি হতে পারতেন। কিন্তু তিনি পড়তে চাইলেন ফিজিক্স/কম্পিউটার সাইন্স। তাই পড়লেন।
তারপর ২০০০ সাল হিট করলো। সেই সংখ্যাগুলো কমে যেতে লাগলো। ২০১০ এর পর, দেশে সোশাল মিডিয়ার প্রভাব বাড়লো। আমাদের দেশে বিসিএস জ্বর শুরু হলো। মেডিক্যাল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেও লক্ষ্য বিসিএস।
দেশের সেরা সেরা স্টুডেন্টরা জীবনভর বিজ্ঞান পড়ে, জটিল সমীকরণ করে, পরীক্ষায় পাশ করলো। তারপর সারা পৃথিবীর মুদ্রার নাম মুখস্ত করা শুরু করলো। রাজধানীর নাম। বইয়ের লেখকের নাম। চরিত্রের নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে এক বিচিত্র পরীক্ষার জন্য তীব্র লড়াই শুরু হলো। সেখানে উদয় হলো কতো কতো বিসিএস মটিভেশনাল চরিত্রের। কোচিং সেন্টার। এক অদ্ভুত অন্ধকার সংস্কৃতিতে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ! সে সংস্কৃতি থেকে কারো রেহাই হলো না।
পুরো দেশ এখন বিজ্ঞান চর্চা শূণ্য। বিজ্ঞান গবেষণা প্রায় শূণ্যই ধরা যায়। ভালো মানের গবেষণা কিছু যে হয় না, তা নয়। কিন্তু ২০ কোটি মানুষের তুলনায় নগন্য। যে স্টুডেন্ট হতে পারতো বিখ্যাত বায়োকেমিস্ট, মলিকিউলার বায়োলজিস্ট সে এখন টেক্স অফিসার হয়েই ক্ষান্ত। যে স্টুডেন্ট হতে পারতো পার্টিক্যাল ফিজিসিস্ট, সে ভূমি অফিসার হওয়ার জন্য দিন-রাত লাইব্রেরিতে বসে বিসিএস'র বই পড়েছে।
এসব সমস্যা বা দোষ স্টুডেন্টদের নয়। যারা বিসিএস দিচ্ছে বা অফিসার হচ্ছে তাদের নয়। দোষ সিস্টেমের। সিস্টেম তো বিজ্ঞানীকে ভালো বেতন দেয় না। গবেষককে সুবিধা দেয় না। প্রতি বছর দশজন গবেষককে দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে না। তাইলে স্টুডেন্টরা কেন সেদিকে যাবে? সুতরাং ভুগবে পুরো জাতি।
এই দেশটা সর্বদিক দিয়ে পরনির্ভরশীল। পরনির্ভরশীল একটা জাতিকে দৃশ্যত ও অদৃশ্যভাবে বিদেশি শক্তি শোষণ করবে। এবং নিজের দেশের মানুষরাও সুযোগ পেলে দেশ ছাড়বে। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। এখানে ব্যবস্থাপনা দাঁড়াবে না।
পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রিটিক্যাল থিংকিং নাই। প্রশ্ন করা যায় না। ব্যবহারিক শিক্ষা নাই। প্রজেক্ট ওয়ার্ক নাই। গবেষণা নাই। স্কুল-কলেজে লক্ষ্য একটাই–এ প্লাস। চোখ বন্ধ করে মুখস্থ করো সব। রোল নম্বর এক থাকতে হবে। এটাই হলো মেধা যাচাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি। তারপর স্নাতক পর্যায়ের পড়াশুনা শেষে বিএসএস। নাইলে দেশ ছাড়ো।
তাইলে দেশের জাতীয় সমস্যায় কাকে খুঁজবো আমরা? নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করবে কে? নতুন ড্রাগ আবিষ্কার করবে কে? নতুন ডিভাইস ডিজাইন করবে কে? কে রকেট উৎক্ষেপনের কথা ভাববে? সামরিক গবেষণা কে করবে? কে দেশ সেরা গবেষক হবে? কে দেশ সেরা শিক্ষক হবে? কে দেশ সেরা প্রকৌশল-স্থপতি হবে? এগুলো কি আমাদের নীতি-নির্ধারকরা ভাবে?