যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকা নিয়ে ফাহামের ভিন্নধর্মী ক্রিটিক

সুবর্ণভূমি রিপোর্ট

প্রকাশ : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৭:০৩ পিএম
আপডেট : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৮:১৮ পিএম
আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকা নিয়ে ফাহামের ভিন্নধর্মী ক্রিটিক

পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার শিল্প ও প্রচারমাধ্যমে বহুত্ববাদ চর্চা না হয়ে একধরনের সাম্প্রদায়িক বর্জননীতি ও কৃত্রিম দূরত্বের দেয়াল গড়ে উঠেছে। সেখানে মুসলিম সাহিত্যিক ও সমাজকে চরমভাবে বর্জন করা হয়। এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করে নিজের ভেরিফায়েড পেজে একটি পোস্ট দিয়েছেন বিশ্লেষক, লেখক, কলামিস্ট এবং সমাজচিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম। সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য তার বিশ্লেষণটি তুলে ধরা হলো:

আমি তখন ক্যাডেট কলেজে। ১৯৯০ থেকে ৯২ সালের কথা। আমাদের কলেজে ‘দেশ’ পত্রিকা রাখা হতো। পেলেই পড়তাম। তখনো পর্যন্ত পত্রিকাটি সম্ভবত পাক্ষিক ছিল। এই পত্রিকার সিরিয়াসনেস এবং সাধনা আমাকে আশ্চর্য করতো। এমন না যে দেশ পত্রিকার সব কিছুই খুব ভালো ছিল। পশ্চিমবঙ্গের লেখক, সিনেমাওলা, কবি - সবার মধ্যেই খুব গভীর একটা ওয়ানাবি আচরণ পোশিদা ছিল যার সবচেয়ে ভালগার রেপ্রেজেন্টেশান হলো সৃজিত মুখার্জির সিনেমা। ওনার অবসেশান হলো কোলকাতাকে য়োরোপ হিসাবে কল্পনা করে নেওয়া, যার ফলাফল  কমিকাল। স্টাইল উইদাউট সাবস্ট্যান্স। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থাই যেন ডিপ্রেশান ও ফেইল্ড ম্যারেজ। কিন্তু এটাও ঠিক যে পশ্চিমবঙ্গের লেখায় একটা নাজাকাত ছিল - লেখালিখিকে আর্ট হিসাবে গ্রহণ করার প্রস্তুতি ছিল যেটা বাংলাদেশে আজো মেইনস্ট্রিম হয় নাই। পশ্চিমবঙ্গের মানুষরা জনপরিসরে 'সম্মান' জিনিসটা আমাদের চেয়ে ভালো বোঝে; বিনিময়ে স্বচ্ছন্দ। খুব ভালো লাগে এই ঐতিহ্যটা। ক্লাস এইট-নাইনে থাকতে দেশ পত্রিকার ব্যাপারে আমার একটা মুগ্ধতা কাজ করতো - যেটা পরে কেটে যায়। মূল কারণ ছিল পশ্চিমবঙ্গের আর্ট-কালচারে "ফিয়ার্স" বলে কিছু ছিল না, খুবই ডোমেস্টিকেটেড ও ডোসাইল। এতো আত্মমগ্নতা যে মনে হতো বোবারা সব সুন্দর কাপড় পরে পার্টি করছে, সরস্বতী যেন সবাইকে তাবিজ করেছে যে অশিক্ষার বশবর্তী হয়ে একটা বাক্যও তুই লিখলে নরকবাস হবে। সেই সাথে বামপন্থী এস্থেটিকস ও রাজনীতির ব্যাপারে পত্রিকাটি এতই আনক্রিটিকাল ছিল যে আমার এখন মনে হয় তারা ইনডকট্রিনেট করতে চাইতো।

কিন্তু একটা ব্যাপার আমার চোখে পড়তো। পড়তো বললে ভুল হবে। আমি আসলে খেয়াল করতাম। দেশ পত্রিকার সূচিপত্র দেখলে আপনার মনে হবে না যে পশ্চিমবঙ্গে কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠী আছে। মুসলমানদের নিজেদের পীড়ন ও সমস্যার কথাও বলছে হিন্দুরা। আজকে তিরিশ বছর পরেও অবস্থা এতটুকু বদলায় নাই। আপনি আজই দেশ পত্রিকার ওয়েবসাইটে বা ফেইসবুক পেইজে যান। খোঁজ করলে দুনিয়ায় আপনি এক-পেয়ে মোরগ পেয়ে যাবেন যে মাস্টারবেট করছে কিন্তু দেশ পত্রিকায় মুসলমান বাঙালি লেখক পাওয়া সত্যিই কঠিন।

সারা পৃথিবীতে বামপন্থীদের ভ্যালু-সিস্টেমে একটা প্রধান ভ্যালু হলো "inclusiveness"। সারা পৃথিবীতে আমাদের সময়ে বামপন্থা ও কনজারভেটিভদের ভ্যালু-সিস্টেমে যুদ্ধের ফল্ট লাইনটাই হলো inclusivenessকে কেন্দ্র করে। ওয়েস্টে বামপন্থীদের inclusiveness নিয়ে যে অবসেশান - সময় বিশেষে আপনাকে বিরক্ত করবে। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখি যে বাঙালির বামপন্থার ভ্যানগার্ড আনন্দবাজার পত্রিকা একটা চরম exclusionary পত্রিকা। এতো লম্বা সময় ধরে (~৮০ বছর) মুসলমানদের এতো নিবিড় নন-পার্টিসিপেশন কেবল দুইটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত করে। হয় আনন্দবাজার পত্রিকা এক্টিভলি মুসলমানদের লেখা ছাপায় না অথবা মুসলমানদের জন্য এই পত্রিকায় পার্টিসিপেশনের বার কৃত্রিমভাবে এতটাই উপরে উঠিয়ে রাখা হয়েছে - যে মুসলমানরাই এই পত্রিকাকে বর্জন করেছে। স্ট্যাটিস্টিক্যালি এটা অসম্ভব যে কোনো সাহিত্য পত্রিকায় এত লম্বা সময় ধরে মুসলমানদের অনুপস্থিতি বজায় রাখতে পারবেন। হতেই পারে না।

হিন্দু বামপন্থা একটা আলাদা ক্যাটাগরি। আমার সব সময় মনে হয়েছে যে হিন্দু বামপন্থা একটা সামাজিক আন্দোলন - হিন্দু বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে সমাজের যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তার বহিঃপ্রকাশের একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্মনিরপেক্ষ পথ। মেটাফিজিক্সকে দুনিয়াবি চিন্তা দিয়ে মোকাবেলা করার ফন্দি। হিন্দু ওয়ার্ল্ডভিউতে অন্য ধর্মের প্রতি প্রবল বিদ্বেষ আছে - তা বলা যাবে না; মিথ্যা হবে। কিন্তু এই ওয়ার্ল্ডভিউতে অন্য ধর্মের প্রতি প্রবল 'অনাগ্রহ' আছে। পৃথিবীতে আপনি হাজার হাজার মুসলমান পাবেন যারা ক্রিশ্চান থিওলজি বিষয়ে এক্সপার্ট লেভেলের জ্ঞান রাখেন। বাংলাদেশেও আমি অল্প কিছু মুসলমান পেয়েছি যারা হিন্দু ধর্মতত্ত্বে পৌনে-এক্সপার্ট। কিন্তু আমি এখনো কোনো হিন্দু স্কলার পাই নাই যে ইসলামীয় কিংবা ক্রিশ্চান ধর্মতত্ত্বে এক্সপার্ট (আমি মুলসলমান ইতিহাসে এক্সপার্ট হওয়ার কথা বলছি না)। তার একটি কারণ হতে পারে যে হিন্দু পাঠকরা এসব বিষয়ে আগ্রহীই না। এবং আরেকটি হতে পারে যে হিন্দু ধর্ম তো প্রসেলেটাইজিং না।

এর একটা বিচিত্র বাস্তব কারণ আছে বলে আমার অনুমান। "সিভিলাইজেশনাল প্রক্সিমিটি" বলে কিছু একটা পৃথিবীতে আছে যেটা ব্যাখ্যাতীত। নিজের অভিজ্ঞতাই বলি। আমি যখন প্রথম লন্ডন বা সিডনি গিয়েছি - আমার সেই শক হয় নি যেটা কলকাতায় গিয়ে হয়েছে। আমি ইসলামীয় পৃথিবী ও ক্রিসেনডোমের পূর্বানুমান কী - সেটা খুব ভালোভাবে বুঝি। যদিও য়োরোপ থেকে আমরা সব দিক থেকে আলাদা কিন্তু য়োরোপীয়ান মোরালিটি ও মোরাল কোড বুঝতে পারি। কেন কেউ কোনো কাজ করে - এর মোটামুটি একটা আন্দাজ আমার আছে। আমি গভীর ডিস্কাশনের পূর্বানুমানগুলো ধরতে পারি ও একই টিউনে যেতে পারি। কিন্তু আমি পাশের বাড়ির একই ভাষায় কথা বলা হিন্দু ভদ্রলোকের সাথে গভীর ডিস্কাশনে যেতে পারি না। কারণ আমরা দুজন সিভিলাইজেশনের দিক থেকে এতটাই দূরে যে আমাদের পূর্বানুমানগুলো ভীষণ আলাদা - সেই সাথে ভয় হয় কখন সে মন খারাপ করে বসে। আমি আজো বুঝতে পারি না কেন ও কীভাবে হিন্দু ধর্মতত্ত্বে 'সুন্দর' উদ্ভুত হয়, ট্রানসেন্ডেন্স কীভাবে আত্মস্থ হয়; 'মোক্ষ'কে কীভাবে দুনিয়াবি কর্মকাণ্ডে 'লক্ষ্য' হিসাবে ট্রীট করা হয়। এই না বোঝা বিষয়গুলো হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রবল অনাগ্রহ ও ক্ষেত্রবিশেষে জাতিবিদ্বেষ উৎপাদন করেছে। আমার সময়ের অভিজ্ঞতার কথা বললে হিন্দুদের অবস্থা মুসলমানদের চেয়ে বেশি খারাপ। তার কারণ রাজনৈতিকও বটে। 

সিভিলাইজেশনাল প্রক্সিমিটি না থাকার কারণেই কি আনন্দবাজারে মুসলমানরা জায়গা পায় না নাকি পত্রিকাটির নাম আসলে 'দ্বেষ'? আমরা শুধু একটা ভুল বানানকে অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন করতাম।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)