যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

সম্প্রীতি রক্ষায় বিভাজনের রাজনীতি নয়, চাই দায়িত্বশীলতা

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
সম্প্রীতি রক্ষায় বিভাজনের রাজনীতি নয়, চাই দায়িত্বশীলতা

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর অন্যতম শক্তি হলো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্য। নানা ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। এই সম্প্রীতি শুধু সামাজিক সৌহার্দ্যের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় সংহতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার প্রশ্নে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিক- সবারই দায়িত্ব রয়েছে।

মাগুরায় এক মতবিনিময় সভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায়চৌধুরীর বক্তব্যে এই বিষয়টিই নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি বলেছেন, কোনো ঘটনার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা খোঁজার ষড়যন্ত্র চলতে দেওয়া হবে না এবং কোনো সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি জীবনমুখী ও গণমুখী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যের এই দুটি দিক- সম্প্রীতি রক্ষা এবং সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা- নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো ঘটনাকে অকারণে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া যেমন সমাজে বিভাজন তৈরি করতে পারে, তেমনি প্রকৃত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা বৈষম্যের ঘটনা যদি থাকে তাকে অস্বীকার করাও অনুচিত। তাই কোনো ঘটনার চরিত্র নির্ধারণে আবেগ, রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি। ‘সাম্প্রদায়িকতার ষড়যন্ত্র’ যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি প্রকৃত সাম্প্রদায়িক অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মাগুরাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জেলা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। জন্মাষ্টমী, পূজা কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় আয়োজন নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। একইভাবে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক অধিকারের অংশ।

এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গুজব, উসকানি বা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীর পরিচয় বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আইনের সমান প্রয়োগ এবং অপরাধের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান জবাবদিহি।

সংস্কৃতিমন্ত্রীর ‘অপসংস্কৃতি বর্জন’ এবং জীবনমুখী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের আহ্বানও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে পারে। খেলাধুলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, লোকসংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড তরুণ প্রজন্মকে বিভাজনমূলক ও উগ্র চিন্তা থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সংস্কৃতিকে কেবল বিনোদনের বিষয় হিসেবে না দেখে সামাজিক সম্প্রীতি নির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গও আলোচনায় এসেছে। রাষ্ট্রের পরিচয়ের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাগরিক হিসেবে প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা। ধর্মীয় পরিচয় যার যার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চর্চার বিষয়; রাষ্ট্রীয় অধিকার ও নাগরিক মর্যাদার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্যের সুযোগ থাকা উচিত নয়।

আজকের বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল প্রত্যক্ষ সহিংসতা নয়; গুজব, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারও। একটি ছোট ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে বড় উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক- সবার বক্তব্য ও আচরণে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে কেউ তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে না; আবার ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে কেউ সমাজে বিভাজনও তৈরি করতে পারবে না। মতের পার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ থাকবে না।

সম্প্রীতি রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও আইনের শাসনের সংস্কৃতি আরও দৃঢ় করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতার নামে ষড়যন্ত্র যেমন প্রতিহত করতে হবে, তেমনি প্রকৃত অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধেও থাকতে হবে দৃঢ় অবস্থান।

কারণ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের শক্তি কোনো একক ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ে নয়; এর শক্তি তার বহুত্বের মধ্যে। এই বহুত্ব ও সম্প্রীতিই রক্ষা করা আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় দায়িত্ব।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)