সম্পাদকীয়
বেতন স্কেল: সরকারি চাকুরেদের জন্য সুখবর
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে একই বেতন কাঠামোয় কাজ করা সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি তাদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি করেছে। সেই বাস্তবতায় নতুন বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্কের অবকাশ নেই। তবে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যতটা স্বস্তিদায়ক, এর সুষ্ঠু ও টেকসই বাস্তবায়ন সরকারের জন্য ততটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর উদ্যোগ সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক। কারণ মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সাধারণত নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপরই বেশি পড়ে। তাদের আয় বাড়লে জীবনযাত্রার মৌলিক ব্যয় মেটানো কিছুটা সহজ হবে।
তবে বেতন বৃদ্ধির হার নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি এর আর্থিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। এমন সময়ে এই বিপুল ব্যয় যুক্ত হচ্ছে, যখন রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতিতে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ফলে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যেন ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অসহনীয় চাপ তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
এ কারণেই তিন ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়। একসঙ্গে পুরো বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করলে সরকারি ব্যয়ে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে এবং বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হয়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকার যেমন অর্থের সংস্থান করতে পারবে, তেমনি অর্থনীতিতেও আকস্মিক চাপ কম পড়বে। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের নামে যেন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
নতুন কাঠামোর আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ভাতা এবং সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণ। এসব উদ্যোগ বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাবও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। তবে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বাস্তবায়ন ২০৩০ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য ও আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা যতটা বাস্তব, ততটাই জরুরি একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।
আরেকটি বিষয় হলো—শুধু বেতন বাড়ালেই সরকারি সেবার মান বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকসেবার মান উন্নয়নের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। জনগণের করের অর্থে যে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে, তার বিনিময়ে জনগণ আরও দক্ষ, সৎ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রত্যাশা করতেই পারে।
নতুন পে-স্কেল তাই কেবল সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রশাসনিক দক্ষতারও পরীক্ষা। সরকারকে একদিকে কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হবে। স্বচ্ছ অর্থায়ন পরিকল্পনা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কঠোর নজরদারি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই বেতন কাঠামোকে একটি টেকসই ও জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্তে পরিণত করতে।
পাশাপাশি আরেকটি বিষয়েও আমরা সরকারের গভীর মনোযোগ প্রত্যাশা করি। তা হলো, সরকারি চাকুরের সংখ্যা খুবই নগণ্য। তুলনায় বেসরকারি চাকুরে, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমিক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ছোট একটি শ্রেণির হাতে বাড়তি টাকা পৌঁছানোর পর তা যদি মূল্য স্ফীতি উসকে দেয়, তাহলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দশা কী হবে! বিশেষ করে উৎপাদকদের টিকে থাকার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে এবং তা দ্রুতই।