সম্পাদকীয়
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মাছ-কাঁকড়াসহ বনজ সম্পদের প্রজনন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট সময়ে আহরণ বন্ধ রাখা জরুরি। এ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাই প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, যাদের জীবন-জীবিকা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের জীবিকার দায়িত্ব কে নেবে?
সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জের বাস্তবতা বলছে, সুন্দরবনের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু পরিবারের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। পুরুষেরা মাছ, কাঁকড়া বা অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ করতে না পারায় কর্মহীন হয়ে পড়েন। কিন্তু সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ঋণের কিস্তি তো থেমে থাকে না। ফলে পরিবারের ব্যয় মেটাতে নারীদেরই অন্যের চিংড়ি ঘেরে দিনমজুরির কাজে নামতে হয়। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কঠোর শারীরিক শ্রম করেও তারা পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম মজুরি পান।
এই বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক সংকটের নয়, একই সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যেরও চিত্র। একই ধরনের কাজে একজন পুরুষ যেখানে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পান, সেখানে নারী শ্রমিকের মজুরি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা- এ বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে যখন পরিবারের আয়-ঘাটতি পূরণে নারীর শ্রমই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তাদের কম মজুরি দেওয়া তাদের ওপর দ্বৈত বোঝা চাপিয়ে দেয়।
সংকট আরও গভীর করেছে জলবায়ু পরিবর্তন। লবণাক্ততার আগ্রাসনে উপকূলের বহু আবাদি জমি কৃষিকাজের উপযোগিতা হারিয়েছে। ফলে সুন্দরবন ও কৃষি- দুই প্রচলিত জীবিকার ওপরই চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন বননির্ভর পেশায় থাকা অনেক পুরুষের বিকল্প কাজের দক্ষতা নেই। কেউ কেউ আবার ইটভাটা, মাটি কাটা, কৃষিশ্রম বা ভ্যান চালানোর মতো কাজ করতে অনাগ্রহী। এর ফল গিয়ে পড়ছে পরিবারের নারীদের ওপর।
সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। নিবন্ধিত জেলেদের একটি অংশ নিষেধাজ্ঞার সময়ে ভিজিএফের চাল পান। কিন্তু প্রকৃত জেলে ও বনজীবীদের একটি বড় অংশ যদি নিবন্ধনের বাইরে থাকেন, তাহলে তারা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। আবার শুধু চাল দিয়ে একটি পরিবারের পুরো মাসের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে তখন অনেক পরিবার আবার দাদন বা মহাজনী ঋণের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদি ঋণনির্ভরতার পথ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় সুন্দরবন সংরক্ষণ নীতিকে আরও মানবিক ও সমন্বিত করা জরুরি। প্রথমেই প্রকৃত জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালীদের সঠিক তালিকা তৈরি করতে হবে। বন বিভাগের বিএলসি, মৎস্য বিভাগের জেলে কার্ড এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য সমন্বয় করে একটি নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। কেউ কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে সহায়তা থেকে বাদ পড়বেন- এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে শুধু চাল নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী নগদ সহায়তা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে। মাছ-কাঁকড়া চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য স্থানীয় কাজের প্রশিক্ষণের সঙ্গে সহজ শর্তে ঋণ, উপকরণ এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
নারীদের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে সমান কাজের সমান মজুরি। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি ছাড়া এ বৈষম্য বন্ধ হবে না।
সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে- এটি আমাদের জাতীয় স্বার্থ। কিন্তু সেই রক্ষার নামে সুন্দরবননির্ভর মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া কোনো টেকসই নীতি হতে পারে না। বনের দরজা যখন সাময়িকভাবে বন্ধ হবে, তখন মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের দরজা খুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। প্রকৃতি সংরক্ষণ ও মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই সুন্দরবনও বাঁচবে, সুন্দরবননির্ভর মানুষও বাঁচবে।