মো. মিজানুর রহমান
সম্প্রতি সাংসারিক কলহে আত্মহত্যা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। এই যে সাংসারিক কলহ, এর সমাধান কি আত্মহত্যা? না। একবার সাংসারিক কলহ শুরু হলে এর সমাধান জটিল হয়ে পড়তে পারে। কারণ যতদিনে মানুষ জানতে পারে যে, একা থাকার স্বাদ পানির মতো নিরামিষ হলেও চটকানো লেবুর তেতো শরবত অপেক্ষা ভালো, ততদিনে পানিতে পরিমাণমতো লবণ (ভালোলাগা/ভালোবাসা) ঢালা হয়ে যায়। তখন লবণপানিতে লেবুর রস (সংসারিক সুখ) অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। মানুষ সংসারে প্রবেশ করে যায়। যারা বোঝে তারা পরিমাণমতো লেবু চিপে শরবত খায়। অর্থাৎ সুখী পরিবারের মর্যাদা পায়।
আর যারা লবণ পানির স্বাদ গাঢ় করতে চায় (শক্ত হাতে সংসারের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়) তারা লেবু অধিক চটকে তা তেতো করে ফেলে এবং এর সংখ্যাই বেশি। অবশ্য এই লেবু চটকানোর জন্য প্রভাবক/ইনফ্লুয়েন্সারও কাজ করে। প্রভাবকেরা পরামর্শ দেয়, “দু’ফোটা যেহেতু বেরিয়েছে, আর এক চাপ দিয়ে দেখো। আরও এক ফোটা বেরোলে ক্ষতি কী?” তখন শেষ এক ফোটার জন্য স্বামী বা স্ত্রী যে চাপ দেয় তাতে তিন ফোটা রস বেরিয়ে যায়, যার দুই ফোটা লেবুর খোসার তেতো রস। তখন পানি, লবণ এবং লেবু বিস্বাদ লাগে। ওই পানি থাকা আর না থাকা সমান হয়ে যায়। ফলস্বরূপ সংসারে তিক্ততা ছড়িয়ে পড়ে। মানসিক অশান্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পৃথিবীতে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে যায়। পৃথিবীকেই জাহান্নাম মনে হয়। তারপর আত্মসম্মান ও পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে স্বামী বা স্ত্রীর কাছে আত্মহত্যাই উপযুক্ত মনে হয়। এতে প্রভাবকসহ স্বামী অথবা স্ত্রীকে এক দড়িতে ফাঁসিতে ঝুলানো যায় এবং তারা তাই করে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান হলে তা নিরসনে প্রয়োজন হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্য কর্তৃক তাদেরকে কাউন্সেলিং করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এধরনের কাউন্সেলিং বিষয়টি ইতিবাচক কাজ করে না। বরং কাউন্সেলিং করতে এসে জটিলতা আরও গাঢ় করে ফেলে এবং মান-অভিমানকে ঝগড়া পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। পরকীয়া ব্যতীত অধিকাংশ সাংসারিক কলহের প্রভাবক পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
এখন এই চাপাচাপির যুগে সাংসারিক জীবনে একটু যন্ত্রণা থাকবেই। চাপাচাপির মাঝে একটি সমঝোতায় এসেই সব সংসার টিকে থাকে। ঐটিই অটুট বন্ধন। যারা বজ্র আঁটুনি দিতে চায় তাদের গেরো ফঁসকে বাঁধে বিপত্তি এবং তখনই শুরু হয় সংসার নিয়ে আপত্তি। তাই যখন সংসারে চাপাচাপির সীমা অতিক্রম করে তখন আত্মহত্যা না করে বেরিয়ে আসাই ভালো। এখনতো অনেকেই সংসারের বাইরে এসেও বেঁচে আছে। অনেকেই নতুন সংসারে পূর্বের সংসার অপেক্ষা অধিক ধৈর্যে সংসার করে যাচ্ছে।
ঢালাওভাবে নারী বা পুরুষের দোষারোপ করে লাভ নেই। নারী মাত্রই নারী। তাদের সম্পর্কে অতীতে যা জানা গেছে, তারা তাই। পুরুষের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু নেই। শুধু সময়ের সাথে উভয়ই আপডেটেড ভার্সন- এই যা তফাৎ। এটা মেনে নিতে হবে। আত্মহত্যা কোনো সমাধান না। আত্মহত্যা করে আপনার অবুঝ শিশুদেরকে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে যাবেন না। আপনার মান-অভিমানের দায় আপনার অবুঝ সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে যাবেন না। এটা আপনার আত্মহত্যার থেকেও বড় অপরাধ।
সন্তানরা বাবা-মা ছাড়া কারো কাছেই শতভাগ নিরাপদ নয়। শুধু আপনার অবুঝ সন্তানের কথা চিন্তা করে হলেও আত্মহত্যার চিন্তা থেকে দূরে থাকুন। আত্মহত্যা এড়াতে প্রয়োজনে সংসার থেকে বেরিয়ে আসুন, নয় দূর থেকে বেড়িয়ে আসুন। পৃথিবীকে সুন্দর করে দেখতে শিখুন। দেখবেন পৃথিবী সুন্দর।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক