যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন পুরুষ, সংসারের হাল নারীর কাঁধে

আসাদুজ্জামান সরদার

, সাতক্ষীরা

প্রকাশ : শনিবার, ২৯ আগস্ট,২০২৬, ১০:০০ এ এম
সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন পুরুষ, সংসারের হাল নারীর কাঁধে

সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেই সাতক্ষীরার উপকূলে থেমে যায় হাজারো পরিবারের আয়ের চাকা। বননির্ভর পুরুষেরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। কিন্তু সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা এনজিও ও মহাজনের ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না। ফলে পরিবার টিকিয়ে রাখতে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে অন্যের চিংড়ি ঘেরে দিনমজুরির কাজে নামতে হয় নারীদের। অথচ একই ধরনের শারীরিক শ্রমে পুরুষের তুলনায় তাদের মজুরি দেওয়া হয় অনেক কম।

শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ পূর্ব কালিনগর এলাকার সাবিনা খাতুনের জীবন এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। তার স্বামী আব্দুস সালাম সুন্দরবননির্ভর জেলে। বনের পাস-পারমিট বা প্রবেশাধিকার বন্ধ থাকলে সরকারি নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে থাকতে হয় তাকে। তখন সংসারের খরচ ও ঋণের কিস্তি চালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে সাবিনার ওপর।

সাবিনা খাতুন বলেন, ‘‘বন বন্ধ থাকলে স্বামী কাজ পায় না। কিন্তু সংসারের খরচ আর ঋণের কিস্তি ঠিকই চালানো লাগে। তাই বাধ্য হয়ে আমাকেই রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পরের চিংড়ি ঘেরে ‘জোন’ (মজুরি) দিতে হয়। আগে মিষ্টি পানিতে ধান হতো, এখন লোনা পানির কারণে আবাদি জমি শেষ। বিকল্প কাজ বলতে শুধু ঘেরের শারীরিক শ্রমই বাকি আছে।”

সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে। বন ও সাগরে মাছ, কাঁকড়া কিংবা অন্যান্য সম্পদ আহরণের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের জীবনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিধিনিষেধ নয়, একই সঙ্গে তা হয়ে ওঠে জীবিকার সংকট।

বছরে কয়েক দফা বন্ধ জীবিকার দরজা

সুন্দরবনের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখে বন বিভাগ। জুন, জুলাই ও আগস্ট-এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটনসহ সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম হওয়ায় এ দুই মাস কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। তবে এ সময়ে মাছসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণ চালু থাকে। এর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিনের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা থাকে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিবন্ধিত জেলে, বাওয়ালী ও মৌয়ালীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার ৫০০। তবে পরোক্ষভাবে দেড় লাখের বেশি মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।

বনজীবীদের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে বন বা সাগরে যাওয়া বন্ধ হলে উপকূলজুড়ে নেমে আসে নীরব অর্থনৈতিক বিপর্যয়। স্থানীয় বাজারে বিকল্প কাজের সুযোগ কম। আবার অধিকাংশ পুরুষের অন্য কোনো কাজের দক্ষতাও নেই। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়া পুরুষদের পরিবর্তে পরিবারের নারীরাই শ্রমবাজারে ঢুকছেন।

মুন্সীগঞ্জ এলাকার বনজীবী নেপাল সানা বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে শুধু সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরি। অন্য কোনো কাজের দক্ষতা আমাদের নেই। ঘেরে যে ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হয়, তার সংখ্যা সীমিত এবং মজুরিও অত্যন্ত কম। ফলে পরিবারের পুরুষরা খুলনা বা ঢাকায় রিকশা চালানো বা ইটভাটায় না গেলে কাজ পায় না। বাধ্য হয়ে পরিবারের নারীদের দিনমজুরি দিতে পাঠাতে হয়।’

একই কাজ, নারীর মজুরি অর্ধেকের কাছাকাছি

নিষেধাজ্ঞার সময়ে নারীদের কাজের সুযোগ বাড়লেও তা অনেক ক্ষেত্রে নতুন ধরনের শ্রম শোষণের জন্ম দিচ্ছে। স্থানীয় নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, একই ধরনের শারীরিক শ্রম করেও পুরুষের তুলনায় তাদের মজুরি কম।

শেফালী বিবি, রহিমা বুলি দাসীসহ একাধিক নারী শ্রমিক জানান, যে কাজের জন্য একজন পুরুষ দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পান, একই শারীরিক পরিশ্রমের কাজে নারীদের দেওয়া হয় মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। কম মজুরির কারণে স্থানীয় ঘের মালিকরাও পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিক নিতে বেশি আগ্রহী হন।

দাতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শেফালী বিবি বলেন, উপকূলীয় এলাকার পুরুষেরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বনে প্রবেশ বন্ধ থাকলে বা পাস না মিললে অনেকে বিকল্প কাজে যুক্ত না হয়ে অলস সময় পার করেন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার ও নারীদের ওপর।

তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনে যাওয়া বন্ধ থাকলে পুরুষেরা কাজের সন্ধানে না গিয়ে তাস খেলে বা সময় কাটিয়ে দিন পার করেন। অথচ তখন সন্তানদের পড়াশোনা, প্রাইভেটের খরচ ও সংসারের যাবতীয় খাবারের খরচ মেটাতে নারীদের চরম হিমশিম খেতে হয়।’

শেফালী বিবির ভাষ্য, উপকূলীয় এলাকার অনেক পুরুষ ইটভাটায় কাজ, মাটি কাটা, ধান রোপণ কিংবা ভ্যান চালানোর মতো কায়িক শ্রমের কাজে যুক্ত হতে চান না। অনেকে এসব কাজকে মান-সম্মানের পরিপন্থী মনে করেন। আবার দীর্ঘদিন সুন্দরবনে কাজ করার অভ্যাসের কারণে এসব কাজের মানসিক ও শারীরিক ধকলও তারা সহ্য করতে পারেন না।

মজুরি বৈষম্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘের বা স্থানীয় কাজে নারী ও পুরুষের কাজের মধ্যে এখনো চরম বৈষম্য রয়েছে। পুরুষ শ্রমিকেরা দিনে সাড়ে চারশ টাকা মজুরি পেলেও নারীদের দেওয়া হয় মাত্র দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা। অথচ অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা কাজ বেশি বোঝেন ও করেন।’

তার মতে, পুরুষেরা বিকল্প কাজে যুক্ত না হওয়ায় পরিবারে অভাব-অনটন ও সহিংসতা লেগেই থাকে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবনের বাইরে এসে বিকল্প জীবিকায় অভ্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলের পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সংকট স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব নয়।

কার্ড নেই, সহায়তাও নেই

সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও উপকূলের জেলে ও বনজীবীদের বড় একটি অংশ পিছিয়ে রয়েছেন। জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে যান। শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি-সাত হাজার ৩৫৫ জন।

সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকাকালে ৫৮ দিনের জন্য ১২ হাজার ৮৭৯ জন নিবন্ধিত জেলেকে ভিজিএফের চাল দেওয়া হয়। তাদের প্রত্যেককে মোট ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি করে চাল দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

তবে স্থানীয় জেলে ও ট্রলার মালিক সমিতির দাবি, সাতক্ষীরায় প্রকৃত জেলের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। সে হিসাবে প্রায় এক লাখের বেশি অনিবন্ধিত জেলে সরকারি ভিজিএফ সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

দাতিনাখালী গ্রামের জেলে শাহজাহান সরদার বলেন, ‘যাদের কার্ড আছে তারাই সাহায্য পায়। বছরের পর বছর ধরে পেশায় থেকেও আমি কার্ড পাইনি। বন্ধের দিনগুলোতে কোনো কাজ না পেয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাতে হয়।’

সহায়তা পাওয়া নিবন্ধিত জেলে আজগর আলীও স্বস্তিতে নেই। তিনি বলেন, ‘যে চাল দেওয়া হয় তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও পাঁচ সদস্যের পরিবার চাল দিয়ে তো আর পুরো মাস চলে না। চালের সঙ্গে তেল, ডাল বা নুন কেনার মতো টাকা থাকে না, তাই আবার দাদন বা ঋণ নিতে হয়।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, ‘আমাদের নিবন্ধিত ৪৯ হাজার জেলের একটি বড় অংশকে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। তবে শুধু চাল দিয়ে একটি পরিবারের খরচ চলে না। তাই আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চালের পাশাপাশি ডাল, তেল বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস অন্তর্ভুক্ত করার লিখিত প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’

প্রকৃত জেলে ও বনজীবীদের বাদ পড়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলে কার্ড এবং বন বিভাগের বিএলসির (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) ডেটাবেজে সমন্বয়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিতদের তালিকাভুক্ত করা হবে।’

ঋণের চাপে বাড়ছে ঝুঁকি

সুন্দরবন গবেষক পিযুষ বাউলিয়া পিন্টুর মতে, সুন্দরবনসংলগ্ন হাজার হাজার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প কাজের সুযোগ না থাকায় তারা দাদনচক্র ও মহাজনী ঋণের জালে আটকে পড়ছেন।

তিনি বলেন, বন বিভাগের পক্ষ থেকে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ বনজীবীদের কাছে এই সুবিধা এখনো অপ্রতুল।

মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত বলেন, ‘শুধু চাল দিয়ে একটি উপকূলীয় পরিবার বাঁচতে পারে না। নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবারপ্রতি চালের পাশাপাশি অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া জরুরি।’

তার মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যজীবীবান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প ও বিকল্প কাজের সুযোগ তৈরি করা না গেলে এসব মানুষকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হবে। ঋণের চাপে নারীরাও শ্রম শোষণের শিকার হবেন।

জলবায়ু পরিবর্তনে সংকট আরও গভীর

সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লোনা পানির আগ্রাসনে উপকূলীয় অঞ্চলের আবাদি জমি ও কাজের সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। পুরুষেরা কাজের খোঁজে পরিযায়ী হচ্ছেন। তাদের অনুপস্থিতি ও বেকারত্বের সময়ে পুরো সংসারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভার সামলাচ্ছেন নারীরাই।

তার ভাষ্য, সরকারি খাদ্য, মৎস্য ও বন বিভাগের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা ফজলুল রহমান বলেন, বন বিভাগের বিএলসি অনুযায়ী সরাসরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলে প্রকৃত বনজীবীদের শনাক্ত করে তাদের সহায়তার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তিনি জানান, বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সহব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ২৯ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় মাছ-কাঁকড়া চাষ এবং হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তবে বন বিভাগ এককভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, খাদ্য, মৎস্য ও বন বিভাগের মধ্যে সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা এবং দাদনচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে বিশেষ ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বনজীবীদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন-এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় যাদের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ বনের দরজা বন্ধ হলে পুরুষের আয় বন্ধ হয়, আর সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে উপকূলের নারীরা কম মজুরিতে কঠোর শ্রমে নামেন। ঋণ, মজুরি বৈষম্য ও সীমিত সরকারি সহায়তার এই চক্র ভাঙতে না পারলে সুন্দরবনসংলগ্ন পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)