বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
টানা বৃষ্টিতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন যশোরের ‘সবজি চারা গ্রাম’ খ্যাত অঞ্চলের কৃষকরা।
এবারের বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন সবজির চারা উৎপাদক যশোর সদরের আব্দুলপুর, পোলতাডাঙ্গা ও বাগডাঙ্গার কৃষকরা। প্রায় অর্ধ কোটি টাকার সবজির চারা বিনষ্ট হয়েছে।
সবজি চারার গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পাওয়া যশোর সদরের আব্দুলপুর, পোলতাডাঙ্গা ও বাগডাঙ্গা গ্রাম। এ অঞ্চলের প্রায় একশ’ কৃষক প্রতি মৌসুমের ৭ মাসে বিভিন্ন সবজির ১০ থেকে ১২ কোটি চারা উৎপাদন করেন। যা বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৩ কোটি টাকা।
তাদের উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা বিভাগের দশ জেলা ছাড়িয়েও বাইরের বিভিন্ন জেলায় যায়।
কৃষকরা মৌসুমে ৪ দফায় সবজির চারা উৎপাদন করে থাকেন। এই অঞ্চলে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রুকলি, বেগুন, টমেটো, মরিচ, খিরা, পটল প্রভৃতি ২০ ধরনের মানসম্মত সবজির চারা উৎপাদন হয়। চাহিদা থাকায় বিভিন্ন জেলা থেকে যেমন কৃষকরা মাঠ থেকে সরাসরি নিয়ে যান, তেমনই গ্রাহলেকর চাহিদামতো কুরিয়ার করেও পাঠিয়ে থাকেন কৃষকরা।
চারা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকরা জানান, বৈশাখ মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত চারা উৎপাদনের মৌসুম। শ্রাবণ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত সময়কাল তারা সর্বত্র সবজির চারা সরবরাহ করে থাকেন। আগাম সবজির চারা কেবল চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের কৃষকরা নিয়ে থাকেন।
সকালে বাঁধাকপির চারা উত্তোলন করছিলেন কৃষক আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এবার আব্দুলপুরে তাদের সবজির চারা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে তার ৪০ হাজার টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া, সপ্তাহ তিন-চার আগে তার দুই বিঘা জমিতে থাকা সবজির চারায় ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে জমির সম্পূর্ণ চারা পুড়ে যায়। এতে প্রায় ১৮ লাখ টাকার চারা বিনষ্ট হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা কখনোই সম্ভব নয়।
কৃষক মোহাম্মদ হাসান বলেন, বর্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দুই বিঘা জমিতে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, মরিচ, বেগুনি ইত্যাদির চারা তৈরি করছি। লাভ হয়তো হবে না, কিন্তু চাষাবাদ না করে বসে থাকলেও চলবে না। বৃষ্টিতে তার প্রায় তিন লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান।
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থেকে চারা নিতে আসেন রফিকুল ইসলাম। তিনি দুই জাতের ১৫ হাজার বাঁধাকপির চারা নিয়েছেন।
একই এলাকার সাহেব আলী গাজী নিয়েছেন ৬ হাজার উন্নতজাতের বাঁধাকপির চারা। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় ৬ হাজার পিস চারা রোপণ করা যায়। তিনি প্রতি হাজার চারা কিনেছেন সাড়ে সাতশ’ টাকা দরে।
বর্তমানে বাঁধাকপির চারা প্রতি পিস মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ১ টাকা থেকে ২ টাকা দরে, টমেটোর চারা ৩ টাকা, বেগুন ১ টাকা এবং অন্যান্য চারা ২ টাকা দরে।
এখন যশোর-চৌগাছা সড়কের আব্দুলপুর গ্রামের রাস্তার দু’পাশে তাকালেই দেখা যায় শত শত পলিথিন শেডে ঢাকা রয়েছে সবজির বীজতলা। মূলত কুয়াশা ও বিরূপ আবহাওয়া থেকে চারা রক্ষার্থে এই শেড তৈরি করেছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আব্দুলপুর, পোলতাডাঙ্গা ও বাগডাঙ্গা গ্রামের প্রায় ৮০ জন সবজির চারা উৎপাদন করেন। প্রায় ৯০ বিঘা জমিতে চারা উৎপাদন করা হয়।
আব্দুলপুর গ্রামের নানা বৈশিষ্ট্যের চারা উৎপাদক আমিন উদ্দিন বলেন, আমাদের এখানে প্রায় ৮০ জন কৃষক আগাম ও শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন ও বিপণন করে থাকেন। মৌসুমে প্রায় ১২ কোটি টাকার বিকিকিনি হয়। কিন্তু এবারের বৃষ্টিতে অনেক চারা বিনষ্ট হয়েছে মাঠে পানি জমে যাওয়ার কারণে। একটি মাত্র সরু ড্রেন থাকায় যথাসময়ে পানি নিষ্কাশিত হতে পারেনি।
তিনি বলেন, আব্দুলপুরের বিস্তীর্ণ মাঠের পানি পাকা ড্রেনের মাধ্যমে পাশে ভৈরব নদে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হলে আর তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে না। বিষয়টি কৃষি বিভাগ, উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
জানতে চাইলে যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, সবসময়ই কৃষকদের সাথে যোগাযোগ করেছি। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইউএনও মহোদয়কে বলেছি। তিনি খুবই আন্তরিক। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করছি, সামনের মৌসুমে তারা এই ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন আর হবেন না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কৃষক মান্নানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বালাইনাশক কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে একটা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছাড়া, ওই কৃষক যাতে সহজশর্তে কৃষিঋণ পেতে পারেন, সেই উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।