তারিক মোহাম্মদ
, ঝিকরগাছা (যশোর)
যশোরের ঝিকরগাছা পৌর মাছবাজারে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। সমিতির নামে অর্থ আদায়, বরফ বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দখল করে দোকান বসানো এবং বেলা ১২টার পর মাছ বিক্রিতে অলিখিত নিষেধাজ্ঞার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, বাজার ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সংস্কার এনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মাছবাজার ব্যবস্থাপনায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। নির্ধারিত চাঁদনির বাইরে পৌরসভার সড়কের ওপর দোকান বসিয়ে ব্যবসা পরিচালনার কারণে বাজার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগ বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে বরফ বিক্রিকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে বরফ সংগ্রহ করা কঠিন ছিল। এতে অতিরিক্ত দামে বরফ কিনতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
বরফ বিক্রির খাতার হিসাব অনুযায়ী, কপোতাক্ষ বরফ কল ও সাইমুন আইস ফ্যাক্টরি, দোদেড়িয়া, ঝাঁপা ও রাজগঞ্জ থেকে মুজিবরের নামে ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪০২ পিস, ২০২৪ সালে ১২ হাজার ৬৩৯ পিস, ২০২৫ সালে ১২ হাজার ৬৮৭ পিস এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬ হাজার ১৭২ পিস বরফ বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতি পিস বরফ থেকে সমিতির নামে ২৮ টাকা করে আদায় করা হলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ ১ হাজার ২০০ টাকা।
এছাড়া, আড়তদারদের কাছ থেকে সমিতির নামে মাছের চালানপ্রতি তিন থেকে চার টাকা করে আদায় করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। বিদ্যুৎ বিল, বাইরের পাইকার ও বাজারের বিভিন্ন অবৈধ দখলদারের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
তবে, অভিযোগের বিষয়ে ঝিকরগাছা বাজার ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. নাদিম সর্দার বলেন, টাকা আদায় করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তিনিই এর হিসাব দিতে পারবেন।
তিনি জানান, আড়ত থেকে চালানপ্রতি তিন থেকে চার টাকা করে সমিতির নামে আদায় করা হয়।
বরফ বিক্রির বিষয়ে নাদিম সর্দার বলেন, আগে মুজিবর নামে একজনের একটি নির্দিষ্ট ঘর থেকেই বরফ বিক্রি করা হতো। অন্য কেউ বিক্রি করতে পারতেন না। তবে কিছুদিন হলো বিষয়টি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
সমিতির সদস্য সুমন ইসলাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের লোকজন সিন্ডিকেট করে বাজারটি ধ্বংস করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলছেন, বাজারে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। তাদের ভাষ্য, হাতেগোণা তিন-চারজন নিজেদের স্বার্থে বাজারকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছেন। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা ১৯৪ জন। বাজারে মোট আড়ত রয়েছে সাতটি এবং খুচরা পর্যায়ে প্রায় ১২০টি দোকান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, প্রতিদিন বেলা ১২টার পর আড়তে মাছ বিক্রির ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকার অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, দূর-দূরান্ত থেকে মাছ নিয়ে আসা পাইকাররা নির্ধারিত সময়ের পর মাছ বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এতে বাজারে স্বাভাবিক বেচাকেনা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে।
মাছবাজার হাটের মালিক শাহীন আলম বিপ্লব বলেন, ‘হাট ডেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমি নিজেই। কারণ বাইরের পাইকাররা ১২টার পর বাজারে মাছ বেচাকেনা করতে না পারলে খাজনা আদায় হচ্ছে না। এই সিস্টেমের পরিবর্তন চাই।’
এ অভিযোগের বিষয়ে ঝিকরগাছা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নান্নু রেজা বলেন, ‘বেলা ১২টার পর মাছ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে- এমন কোনো বিষয় আমার জানা নেই।’
ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান সামাদ নিপুণ বলেন, মাছবাজারের সিন্ডিকেট দ্রুত ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া চলমান আছে। পাশাপাশি মাছবাজার সম্প্রসারণ করাটাও জরুরি। বাজারে গাড়ি ঢোকার জন্য প্রশস্ত রাস্তা দরকার।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামের কাছে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দসমিতির অন্যান্য সদস্যরা যেভাবে চলতে বলেন, আমি সেভাবেই চলি।’
তিনি স্বীকার করেন, সমিতির নামে বরফ ও মাছের চালান থেকে টাকা আদায় করা হয় এবং এসব টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। তবে অন্য কোনো খাত থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
বরফের হিসাব ও অর্থ আদায়ের বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সমিতির হিসাবের আওতাভুক্ত। তবে সমিতির মাসিক বা বার্ষিক মোট আয় কত-এ বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। তিনি জানান, বর্তমান কমিটির অধীনেই সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে ঝিকরগাছা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. নূরোল ইসলাম বলেন, সমিতির বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আগামী দুই-চার দিনের মধ্যে নতুন কমিটির নির্বাচনের তারিখ প্রকাশ করা হবে।