শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে যশোর পৌর এলাকায় বেড়েছে মশার উপদ্রব। রাতের পাশাপাশি দিনের বেলাতেও মশার উৎপাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বাসিন্দারা। কয়েল, মশারি কিংবা আগুন দিয়ে ধোঁয়া সৃষ্টি করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ।
বিভিন্ন এলাকায় উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ময়লা আবর্জনা, ড্রেন, ঝোপঝাড় ও জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়লেও নিয়মিত ও কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম না থাকার অভিযোগ উঠেছে পৌর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
এদিকে, গত তিন বছরে শুধু মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে যশোর পৌরসভা ব্যয় করেছে ৩০ লাখ ছয় হাজার ৬০০ টাকা। এত টাকা ব্যয়ের পরও মশার উপদ্রব কমেনি। বরং চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।
যশোর পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শ্রাবণী রায় বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষের মশা নিধনে তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। মশার কামড়ে দিনের বেলাতেও মশারি টাঙিয়ে থাকতে হচ্ছে। আশপাশে ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকে। সেখানে পানি জমে মশা জন্ম নিচ্ছে। শিশুদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মশক নিধনে ব্যয় হয়েছে দশ লাখ ২৫ হাজার ৯৫০ টাকা। ২০২৫ সালে ব্যয় হয়েছে দশ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ টাকা। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ব্যয় হয়েছে নয় লাখ ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা। এই ব্যয়ের বড় অংশ মশক নিয়ন্ত্রণে ওষুধ, সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে বলে পৌরসভা সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালে মশা নিধনের জন্য ভারত থেকে দুই ধরনের ওষুধ আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডাবল ২১৬ লিটার এবং এগ্রো মাইথিন ৩২ লিটার। ওই বছর মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাজেট ধরা হয় ছয় লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
পৌরসভা সূত্র বলছে, শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত এক সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় মশক নিধন স্প্রে করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লালদীঘির পাড়, কেন্দ্রীয় কারাগার, ডিসি বাংলো, এসপি বাংলো, পৌর পার্ক, ঘোপ সেন্ট্রাল রোড স্টাফ কোয়ার্টার, শ্রীধর পুকুর পাড়, র্যাব অফিস, যশোর জেনারেল হাসপাতাল, ম্যাজিস্ট্রেট কোয়ার্টার, গণপূর্ত সার্কেল, কোতোয়ালি থানা ও পুলিশ লাইন এলাকা। তবে এসব এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্প্রে করা হলেও মশার উপদ্রব কমেনি।
দায়িত্বপ্রাপ্ত মশক নিধন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক মন্টু বলেন, অভিযোগ পাওয়া এলাকায় প্রতিটি অলিগলি, রাস্তাঘাট, ঝোপঝাড়, ড্রেন ও আবর্জনার স্থানে মশক নিধন স্প্রে করা হয়েছে। এরপরও কোথাও অভিযোগ থাকলে পুনরায় স্প্রে করা হবে।
পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু বলেন, নিয়মিত মশা নিধনের কাজ চলছে। যারা অভিযোগ করছে তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য পৌরসভার ৩২টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ফগার মেশিন এবং ৩০টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন। কয়েকটি মেশিন বিকল রয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে সেগুলোর মেরামত শেষ হলে নয়টি ওয়ার্ডে একসঙ্গে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ‘মশার উপদ্রব বেড়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমিও এই পৌর এলাকার বাসিন্দা। পৌর প্রশাসক হওয়ায় মশা আমাকে ছাড় দিচ্ছে না। পৌরবাসীর কথা মাথায় রেখে এবার বিদেশ থেকে উন্নতমানের মশক নিধনের তেল কেনা হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক জানান, কিউলেক্স মশার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা এডিস মশার ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। ফগিংয়ের মাধ্যমে উড়ন্ত মশা সাময়িকভাবে কমানো সম্ভব হলেও প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন মশা তৈরি হতে পারে। এ কারণে নিয়মিত লার্ভা জরিপ, প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ ও ধ্বংস, বাড়িভিত্তিক অভিযান এবং কার্যকর কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ৬০৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫৩ জন চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ৪৮ জন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সরকারি হিসাবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর তথ্য নেই। তবে বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যুর কথা জানা গেছে। তাদের মধ্যে গত ৪ জুলাই সোহেল হোসেন নামে ২৯ বছর বয়সী এক যুবক এবং গত ২৪ আগস্ট যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদিবা সাহার মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান বিবেচনায় রেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লে বিশেষ ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হবে এবং অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা যায়।