প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি অনিয়ম স্বেচ্ছাচারিতা: শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন, ভাঙচুর
পদত্যাগের দাবিতে দেওয়ালে স্লোগান, ফলাফল ক্রমশ নিম্নমুখী
রায়হান সিদ্দিক
, যশোর
প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা আর রুচিহীন কার্যকলাপে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ওই শিক্ষককে অপসারণের দাবিতে যশোর সদরের চাঁচড়া ইউনিয়নের সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিতে ক্লাস বর্জন করছে শিক্ষার্থীরা। তারা স্কুলভবনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান লিখেছে, ভাঙচুর করেছে কার্যালয়।
প্রধান শিক্ষক পাপিয়া পারভীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে ‘সত্য’ বলছেন স্কুলটির অন্য শিক্ষক ও অভিভাবকও। শিক্ষা অফিসও এই সব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে। ইউএনও বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক তাদের বলেছেন, ‘তোরা আমার সামনে আসবি না, তোদের দেখলে আমার ঘেন্না করে’- এই বক্তব্য একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার। বিদ্যালয়টির কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর উদ্দেশে ওই প্রধান শিক্ষিকা এমন কথা বলেছেন বলে অভিযোগ তুলছেন শিক্ষার্থীরা। দৃশ্যত এই একটি কথার জেরে ভাঙচুর করা হয়েছে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষ। ওই শিক্ষিকার পদত্যাগের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনও করছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে শুধু একটি কথাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের এমন আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য; সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মিলেছে ভয়াবহ তথ্য।
গত সোমবার একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে সুবর্ণভূমিকে বিদ্যালয়টির বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে তথ্য দেন স্থানীয় একজন বাসিন্দা। পরের দিন সকাল ৯টার দিকে বিদ্যালয়টিতে তথ্য সংগ্রহে গেলে উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশের মুখে দেখা মেলে একদল নারী শিক্ষার্থীর। সাংবাদিক পরিচয় জেনে শিক্ষার্থীরা ওই প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভের কথা বলতে শুরু করে।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া পারভীন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের সাথে অসদাচরণ করে আসছেন। কথায় কথায় পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিতেন তিনি। এমনকি মুসলিম মেয়ে শিক্ষার্থীদের বোরকা কিংবা হিজাব পরা নিয়ে কটাক্ষ করেন এই শিক্ষিকা। তার রোষানলে সবথেকে বেশি পড়েছে নবম ও দশম শ্রেণির নারী শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন তিনি- এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিদ্যালয়টিতে চলমান বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ঘটে গত ১৯ আগস্ট।
দশম শ্রেণির একজন মেয়ে শিক্ষার্থী জানালো, ‘ম্যাডাম আমাদের ভূগোল ক্লাস নেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্লাস না নেন না। গত বুধবার আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ জানাতে যাই। এ সময় তিনি আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে বলেন, আমাদের দেখলে তার নাকি ঘেন্না লাগে। ক্লাসের বিষয়ে একপর্যায়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলতে বলেন তিনি। একপর্যায়ে আমরা প্রতিবাদ জানালে তিনি আমাদের টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।’
আরেক মেয়ে শিক্ষার্থী বলে, ‘‘এমনিতেই তিনি (প্রধান শিক্ষক) নিয়মিত ক্লাস নেন না। মাঝেমধ্যে ক্লাসে আসেন। তখন কোনো কিছু না বুঝলে ম্যাডামের কাছে জিজ্ঞেস করি। তিনি জবাব দেন, ‘তোর বাপের মাথা’। ল্যাবে একটা ফ্যান লাগানোর কথা বলায় তিনি তা বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে বলেন। ছুটি চাইতে গেলেও আমাদের সাথে বাজে ব্যবহার করেন তিনি।”
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ওই প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলছেন বিদ্যালয়টির অন্য শিক্ষকরাও। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন তারা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয় কমিটি গঠন না করে প্যাটার্নভুক্ত অফিস সহকারী কাম হিসাবরক্ষক থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে বাইরে থেকে লোক নিয়োগের মাধ্যমে ও নিজে শিক্ষার্থীদের নিকট বেতন-ভাতা আদায় করে তা ভুয়া বিল-ভাউচার করে আত্মসাৎ করেন। বিগত ১৫/০৭/২০২৬ খ্রি. তারিখে অবৈধভাবে নিয়োগ দেওয়া বহিরাগত মো. হাবিবুর রহমানকে দিয়ে সহকারী শিক্ষক মো. আবদুল্লাহ আল মামুনকে লাঞ্ছিত করা হয়। সরকার প্রদত্ত টিউশন ফির টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণের কথা থাকলেও তিনি তা আত্মসাৎ করেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে দাপ্তরিক ভাষা ব্যবহার না করে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। বিদ্যালয়ের দোকান ভাড়া আদায়, পুরাতন খাতাপত্র বিক্রয় ও প্রশংসাপত্রের ফি আদায় করে তা আত্মসাৎ করেন। পরিবেশ বিনষ্ট করে বিদ্যালয়ের গাছ কাটা, বিদ্যালয়ের ইট ও অন্যান্য সামগ্রী নিজের বাড়িতে ব্যবহার করেন। প্রয়োজনীয় শিখন উপকরণ সরবরাহ না করা এবং বিদ্যালয়ে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকলেও নিয়মিত হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরকে শিক্ষকদের অফিশিয়াল কাজে সহযোগিতা না করার মৌখিক আদেশ দেন। বিশেষ প্রয়োজনে শিক্ষকরা নৈমিত্তিক ছুটি চাইতে গেলে ছুটি না দেওয়ার তালবাহানা করেন।’
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষিকা মিতা রানী বলেন, ‘ম্যাডাম আমাদের মানুষ মনে করেন না। আর তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট মনে করেন। সব সময় আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করেন। বিভিন্ন সময় প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। কোনো এক অদৃশ্য শক্তিতে তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।’
আরেক সহকারী শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি বিদ্যালয়ের নতুন ভবনকে তিনি নিজের ভবন দাবি করে শুধু সহকারী প্রধান শিক্ষক ছাড়া অন্য শিক্ষকদের পুরনো ভাঙাচোরা বিল্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমি এই নতুন ভবন নিয়ে এসেছি, তাই এখানে আপনারা বসতে পারবেন না।’
ওই সহকারী শিক্ষক আরও অভিযোগ করে বলেন, নতুন ভবন বরাদ্দের আগে সরকারি অফিসে ঘুস দেওয়ার বলে সব শিক্ষকের বাড়িভাড়া ভাতা থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়েছেন প্রধান শিক্ষিকা, যে টাকা তিনি নিজেই আত্মসাৎ করেছেন।
স্কুলটির ক্রীড়া শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সব শিক্ষক এক হয়ে গত ১৬ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আমাদের দাবি, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের সমন্বয়ে আয়-ব্যয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা, পরীক্ষার কক্ষ পরিদর্শক ভাতা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ভাতা, সরকার প্রদত্ত টিউশন ফি প্রদানের ব্যবস্থা করা ও বিধি মোতাবেক স্বচ্ছতার সাথে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে হবে। পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় শিখন উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সাথে সদয় আচরণ ও বহিরাগত দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছিত করার আইনানুগ বিচার করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দেন। তার ভিত্তিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার প্রধান শিক্ষককে মৌখিকভাবে বরখাস্ত করার কথা বলেন। কিন্তু পরে এই বিষয়ে অফিসিয়ালি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এর ফলে বর্তমানে তার দুর্নীতি ও অসদাচরণের মাত্রা আরও বহুগুণে বেড়ে গেছে, যা আমাদেরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০১ সালে সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভূগোলের শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন অভিযুক্ত পাপিয়া পারভীন। সে সময় তিনি সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করতেন। কিন্তু ২০১৬ সালে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর বদলে যেতে শুরু করে তার আচরণ। ধীরে ধীরে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠেন তিনি। এমনকি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নির্বাচনেও তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে কোনো কমিটি নেই। অভিযোগ আছে, তার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন সাড়াপোল এক নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি আদালতে কাজ করেন। এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাচারিতা করে আসছেন। আর প্রধান শিক্ষিকার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি স্থানীয়রাও।
১৯৭৩ সালে সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই স্থানীয়ভাবে শিক্ষার মান বাড়তে থাকে, যার ধারাবাহিকতা ছিল ২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত। তবে বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। সবশেষ ২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এই বিদ্যালয় থেকে অংশগ্রহণ করে ৩৩ জন শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে পাস করেছেন ২৬ জন। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে ৪৫৪ জন, যেখানে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৫০২ জন, এসএসসি পরীক্ষায় ৯১ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে পাসের হার ছিল শতভাগ। ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৫৫১ জন, যেখানে এসএসসি পরীক্ষায় ৫৬ জন অংশগ্রহণ করলেও পাস করে মাত্র ২১ জন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া পারভীনের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম সাইফুল আলম বলেন, সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া পারভীনের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার হক বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।