সম্পাদকীয়
যশোরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মধুসূদন তারাপ্রসন্ন (এমএসটিপি) বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি সুবর্ণভূমিতে একটি রিপোর্ট প্রচারিত হয়। এরপর বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া এবং অভিযুক্ত খণ্ডকালীন শিক্ষক শিমুল মণ্ডলের সাময়িক বরখাস্ত- পুরো ঘটনাটিই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে নির্যাতন করার কোনো সুযোগ শিক্ষকের নেই। বিশেষ করে অভিযোগটি যদি কোচিংয়ে না পড়ার কারণে হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়ার কথা আস্থা, নিরাপত্তা, শ্রদ্ধা ও শিক্ষাদান। সেখানে ব্যক্তিগত কোচিং বা আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগ শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অভিযোগ গুরুতর হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা ন্যায়সঙ্গত নয়। তাই এ ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে কোনো গাফিলতি ছিল কি না- সবকিছুই খতিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ অসত্য বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন মন্তব্যও উপেক্ষা করার মতো নয়। সেখানে শুধু অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি নয়, বিদ্যালয়ে কোচিং-বাণিজ্য, অতিরিক্ত ক্লাসের নামে অর্থ আদায় এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোচিংয়ে পড়তে বাধ্য করার মতো অভিযোগও উঠে এসেছে। এগুলো সত্য কি না, সেটিও যথাযথ তদন্তের বিষয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত না করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে না।
বিশেষ করে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত কোচিং ব্যবসার বাজার হতে পারে না। কোনো শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে যথাযথ শিক্ষা না দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার দিকে ঠেলে দেন, কিংবা কোচিংয়ে না পড়লে নম্বর, ফলাফল বা অন্য কোনোভাবে হয়রানির ভয় দেখান, তাহলে তা শুধু অনৈতিক নয়; শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থাকেও ধ্বংস করে।
অভিভাবকদের অভিযোগে যদি এমন কোনো বাস্তবতা থেকে থাকে, তাহলে তার প্রতিকার জরুরি। কারণ আর্থিক সামর্থ্যের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পড়তে বাধ্য না হয়- এটি নিশ্চিত করা শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লাস বৈধ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাক্রমের অংশ কি না, নাকি তার আড়ালে বাণিজ্যিক কোচিং পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি একটি বালিকা বিদ্যালয়। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির আরও বেশি। শিক্ষক পুরুষ না নারী- এটি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়; বরং প্রত্যেক শিক্ষক ও কর্মচারীর আচরণ, পেশাগত নৈতিকতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধই হওয়া উচিত মূল মানদণ্ড। একই সঙ্গে শিশুদের সঙ্গে আচরণবিধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যালয়ে কার্যকর অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
এ ঘটনায় অভিভাবকদের ক্ষোভকে আমরা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক বলে মনে করি। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে অভিভাবকের প্রথম প্রত্যাশা, সে নিরাপদ থাকবে। সেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষোভ যেন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দিকে না যায়। অভিযুক্তকে শায়েস্তা করার বদলে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে পুরো শিক্ষকসমাজ বা বিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে একসঙ্গে অভিযুক্ত করাও সমীচীন নয়।
একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কয়েকজনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড যেন ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেটিও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। আর সেই সুনাম রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সত্যকে আড়াল না করা; বরং সত্য উদঘাটন করা। আমরা আশা করি, চলমান তদন্ত দ্রুত শেষ হবে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে আপস করা যায় না। শিক্ষকতা কোনো ব্যবসা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্বে ব্যর্থতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার কোনোভাবেই প্রশ্রয় পাওয়া উচিত নয়।