সম্পাদকীয়
গুম-খুন-নির্যাতনের শিকারদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনো রাষ্ট্রের জন্যই কেবল বিচ্ছিন্ন মানবিক বিপর্যয় নয়; এগুলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফ্যাসিবাদী আমলজুড়ে ভিন্ন মতাবলম্বী হাজার হাজার মানুষ এসব ঘটনার শিকার হয়েছেন। তাদের পরিবারগুলোর অনেকেই বিচার, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই বাস্তবতায় তাদের কল্যাণ, পুনর্বাসন, সুচিকিৎসা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্র যখন কোনো নিপীড়নের শিকার নাগরিকের কষ্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে, তখন সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না; এর সঙ্গে ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নও যুক্ত হয়। বিশেষ করে যেসব পরিবার বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান, নিহত স্বজনের বিচার কিংবা মিথ্যা মামলায় হয়রানির অবসানের অপেক্ষায় থেকেছে, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও মানবিক পদক্ষেপ।
তবে শুধু স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করলেই ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে- এমন ধারণা করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর আইনি কাঠামো, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার নির্ধারিত থাকবে এবং ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো বাস্তব ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। একই সঙ্গে গুম ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, ক্ষতিপূরণ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। কোনো পরিবারের প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, কোনো নির্যাতনের ক্ষত পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু সত্য প্রকাশ, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফলে নতুন অধিদপ্তরের কাজ যেন শুধু আর্থিক সহায়তা বিতরণ বা তালিকা প্রণয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ ও তালিকা প্রণয়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে কাউকে বাদ দেওয়া কিংবা কাউকে অযাচিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগ ও তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। স্বরাষ্ট্র, আইন, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, অর্থ, পররাষ্ট্র ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বের সঙ্গে বিষয়টি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই অধিদপ্তরকে কার্যকর করতে হলে শুধু নতুন একটি কাঠামো তৈরি নয়, বরং পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ জনবল, তথ্যভাণ্ডার এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
জাতিসংঘের প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত নীতিমালা এবং বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে এই উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু আন্তর্জাতিক নীতি ও সাংবিধানিক অঙ্গীকারের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তব প্রয়োগে। ভুক্তভোগী পরিবারকে যেন সরকারি দপ্তরের দরজায় বছরের পর বছর ঘুরতে না হয়, সে জন্য সহজ ও সময়সীমাবদ্ধ সেবা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, এই উদ্যোগকে কোনো দল বা সরকারের রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করা যাবে না। আজ যারা ক্ষমতায়, কাল তারা ক্ষমতার বাইরে থাকতে পারেন; কিন্তু নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্নটি স্থায়ী। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা সরকার পরিবর্তনের পরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অতীতের অন্যায় স্বীকার করা, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। নতুন অধিদপ্তর সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে তার সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়ের ওপর- এটি যেন কাগজে-কলমে আরেকটি সরকারি দপ্তর না হয়ে সত্যিকার অর্থে ভুক্তভোগী মানুষের আশ্রয়, অধিকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সঙ্গে যদি সত্য উদ্ঘাটন, বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা যায়, তবেই এই উদ্যোগ তার প্রকৃত অর্থ ও মর্যাদা লাভ করবে।