সম্পাদকীয়
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর খাতা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবেদন আমাদের প্রচলিত মূল্যায়নব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোরে এবার ২৫টি বিষয়ে মোট ৭৪ হাজার ৭১৭টি পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ হাজার বেশি। সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ইংরেজি বিষয়ে। সংখ্যাটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কোনো শিক্ষার্থী যদি মনে করে তার প্রত্যাশিত নম্বরের সঙ্গে প্রাপ্ত নম্বরের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে, তাহলে তা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুনর্নিরীক্ষণ মানে কেবল খাতা আবার দেখা নয়; বরং নম্বর যোগ-বিয়োগে ভুল হয়েছে কি না, কোনো উত্তর মূল্যায়নের বাইরে রয়ে গেছে কি না কিংবা নম্বর প্রদানে কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়েছে কি না- এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা।
তবে প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর এত বিপুলসংখ্যক পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন কেন হচ্ছে? গত বছর যশোর বোর্ডে আবেদন ছিল ৪৯ হাজার ৭৭৯টি; এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৭১৭-তে। এত বড় বৃদ্ধি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার বিষয় নয়। এর পেছনে বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে ‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি অনুসরণের কারণে বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর তথাকথিত ভালো ফলাফল অর্জন এবং হঠাৎ সেই ব্যবস্থা থেকে সরে আসার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি অনুধাবনে ব্যর্থতা কি দায়ী? নাকি পরীক্ষার্থীর প্রত্যাশা বৃদ্ধি, ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল ধারণার মতো কারণ থাকতে পারে? কিন্তু মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি বা অসতর্কতার আশঙ্কাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা দরকার।
পরীক্ষকরা বিপুলসংখ্যক খাতা মূল্যায়ন করেন। কাজটি কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। কিন্তু শিক্ষার্থীর একটি নম্বরও তার শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ভুল যোগফল, একটি উত্তর মূল্যায়ন না করা কিংবা নম্বর প্রদানে অসাবধানতা একজন শিক্ষার্থীর গ্রেড, জিপিএ, পছন্দের কলেজে ভর্তি এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মূল্যায়নকারীদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জানিয়েছেন, আবেদন করা প্রতিটি খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে এবং ভুল পাওয়া গেলে তা সংশোধন করা হবে। এই ঘোষণা ইতিবাচক। দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে পরীক্ষা আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এটি প্রয়োজনীয় হলেও শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। কেন ভুল হচ্ছে, কোন পর্যায়ে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে তা কমানো যায়- সেসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা দরকার। পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন নির্দেশিকার যথাযথ প্রয়োগ, নম্বর যোগ ও সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের যাচাই- এসব ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা যেতে পারে।
কোনো খাতায় নম্বর পরিবর্তন হলে কেন পরিবর্তন হলো, সে বিষয়ে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অযথা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনকে উৎসাহিত না করে শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে পুনর্নিরীক্ষণ যৌক্তিক এবং এর আওতায় ঠিক কী যাচাই করা হয়।
শিক্ষা কেবল নম্বরের প্রতিযোগিতা নয়; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় একটি পরীক্ষার নম্বর শিক্ষার্থীর পরবর্তী পথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে সামান্য ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। যশোর বোর্ডে এবার পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের যে ব্যাপকতা দেখা গেছে, সেটিকে তাই শুধু আবেদন নিষ্পত্তির প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের পরীক্ষা ও মূল্যায়নব্যবস্থার মান, নির্ভুলতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়েরও একটি সুযোগ।