যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

উপকূলবাসীকে সহায়তা দয়া নয়, এটি ন্যায্যতার দাবি

প্রকাশ : রবিবার, ১৬ আগস্ট,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
উপকূলবাসীকে সহায়তা দয়া নয়, এটি ন্যায্যতার দাবি

লবণাক্ততা যেভাবে বাড়ছে তাতে উপকূলীয় কৃষিজমি গ্রাস করে এটি ধীরে ধীরে মানুষের জীবন, জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাতে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় জনজীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্যোগের চিত্র নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি এক মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট।

গত তিন দশকে সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় ফসলি জমি কমে যাওয়া এবং অনাবাদি জমি বেড়ে যাওয়ার তথ্যটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। যে জমি একসময় কৃষকের খাদ্য ও আয়ের প্রধান উৎস ছিল, সেখানে এখন লবণাক্ত পানি দীর্ঘ সময় জমে থাকে। ফলে কৃষি উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; স্থানীয় অর্থনীতির প্রতিটি স্তরেই এর অভিঘাত পড়ছে।

লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে অনেক কৃষক চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকেছেন। কিন্তু চিংড়ি অর্থকরী হলেও এটি কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থানের বিকল্প নয়। ধানের জমি ঘেরে পরিণত হলে জমির মালিক হয়তো আয় করতে পারেন, কিন্তু কৃষিশ্রমিকের কাজ কমে যায়। ফলে একদিকে রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। এই বৈপরিত্যকে নীতিনির্ধারণের সময় অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

একই সংকট সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবনেও। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের আয় কমছে; বনজ সম্পদ আহরণের সুযোগ সীমিত হচ্ছে; নদী ও খালে মাছের প্রাপ্যতাও আগের মতো নেই। বন সংরক্ষণ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু বন রক্ষার নামে বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে জীবিকার অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিলে সেই সংরক্ষণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। বনকে রক্ষা করতে হলে বনঘেঁষা মানুষের জীবন ও জীবিকাকেও সুরক্ষিত করতে হবে।

উপকূলীয় নারীদের পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। পুরুষের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় নারীরা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা হাঁস-মুরগি পালনের মতো কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু লোনা পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, স্থানীয় জীবিকার সংকট মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার আশায় মানুষ ধারদেনা করছে, প্রতারণার শিকার হচ্ছে, কেউ কেউ শূন্য হাতে দেশে ফিরছে। আবার অনেকে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে নিজেদের দক্ষতা ও পেশাগত পরিচয় হারিয়ে কম মজুরির কাজে যুক্ত হচ্ছে। এভাবে জলবায়ুজনিত সংকট ধীরে ধীরে সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্যকেও বাড়িয়ে তুলছে।

বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে গুরুতর এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উপকূলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জীবিকা পরিকল্পনা। লবণসহিষ্ণু ধান ও অন্যান্য ফসলের সম্প্রসারণ, মিঠাপানির সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, চিংড়ি চাষের জন্য পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এলাকা নির্ধারণ এবং কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন, কাঁকড়া ও মাছ চাষ, মৌচাষ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য বিকল্প জীবিকার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ যেন কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের সঙ্গে পুঁজি, বাজার, প্রযুক্তি ও বিপণনব্যবস্থা যুক্ত না হলে বিকল্প জীবিকা বাস্তবে টেকসই হবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উপকূলীয় মানুষের জীবনকে জলবায়ু অভিযোজনের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন বা বন সংরক্ষণ- এসব অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করলে কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘস্থায়ী ফল দেবে না।

উপকূলের কৃষক, জেলে, বনজীবী ও নারীরা বাংলাদেশের জলবায়ু সংকটের প্রথম সারির ভুক্তভোগী। অথচ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের দায় সবচেয়ে কম। তাই তাদের জন্য সহায়তা কোনো দয়া বা অনুদান নয়; এটি ন্যায্যতার দাবি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)