আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
ভারতে পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতায় একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ উপজেলার দুইজনের মৃত্যুর খবরে দুই পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া ও তেঁতুলিয়া গ্রামের পরিবেশ।
প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে এখন স্বজনদের একটাই আকুতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক তাদের মরদেহ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে বরেয়া গ্রামে মৃত আলিমুজ্জামান সাজুর (৪৫) বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের এক গভীর শোকাবহ পরিবেশ। বড় ভাই-ভাবিসহ পরিবারের সদস্যরা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কয়েকদিন আগেও যে বাড়িতে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, সেখানে এখন শুধুই শোক আর অপেক্ষা।
মর্মান্তিক এ ঘটনার শিকার আলিমুজ্জামান সাজু মৃত ইউনুচ সরদারের ছেলে। তিনি পেশায় ঘের ব্যবসায়ী ছিলেন।
চিকিৎসার জন্য পাঁচ-ছয়দিন আগে ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। কোলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন পরিবারের সদস্যরা।
সাজুর বড় ভাই সাহেব সরদার বলেন, ‘আমার ভাই চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ টেলিভিশনে দেখি কোলকাতার একটি হোটেলে আগুন লেগেছে। পরে জানতে পারি, ওই হোটেলেই আমার ভাই অতিথি হিসেবে ছিলেন। খবর পাওয়ার পর আমাদের একজন আত্মীয়কে সেখানে পাঠানো হয়। ছবির সঙ্গে লাশের মিল পাওয়ার পর নিশ্চিত হই, আমার ছোট ভাই আর নেই।’
কথা বলার মাঝে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
বলেন, ‘সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার ভাইয়ের মরদেহটা যেন দ্রুত দেশে এনে আমাদের কাছে দেওয়া হয়। আমরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে চাই।’
মৃত সাজুর ছোটবেলার বন্ধু ও সহপাঠী রফিকুল ইসলামও বন্ধুকে হারিয়ে শোকে কাতর।
তিনি বলেন, ‘সাজু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমরা দু’জন একসঙ্গে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। একসঙ্গে খেলাধুলা করেছি, বড় হয়েছি। ডাক্তার দেখাতে কোলকাতায় গিয়ে সে মারা গেল এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুরোধ, সাজুর লাশটা যেন অতিদ্রুত দেশে আনা হয়। আমরা যেন শেষবারের মতো বন্ধুকে দেখতে পারি এবং নিজের হাতে মাটি দিতে পারি।’

অন্যদিকে একই অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন কালিগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের রেবতী সরকার (৩৬)। তার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে তালা ঝুলছে। চারপাশে নীরবতা। পরিবারের সদস্যরা ভারতে অবস্থান করায় বাড়িটি যেন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে।
রেবতীর স্বামী ভবেশ সরকার। তাদের ছেলে অনিক সরকার অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এবং মেয়ে ত্রিশা সরকার ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। তারা বর্তমানে ভারতের উত্তরাখণ্ডে অবস্থান করছেন বলে পরিবারের একটি সূত্র জানিয়েছে।
রেবতীর স্বজন তপন সরকার বলেন, ‘রেবতী আমার বৌদি। বুধবার রাতে বৌদির ছেলের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে একটি হোটেলে আগুন লেগে বৌদি মারা গেছেন। দাদা বাংলাদেশে ছিলেন, তবে এখন তার সঙ্গেও ফোনে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাদা-বৌদির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, তারাও ভারতে আছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটি কীভাবে এই শোক সামলাবে, সেটাই এখন বড় চিন্তার বিষয়।’
চিকিৎসার জন্য প্রিয়জনদের ছেড়ে ভারতে গিয়েছিলেন সাজু ও রেবতী। পরিবারের আশা ছিল, চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরবেন তারা। কিন্তু সেই অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে মরদেহ ফেরার অপেক্ষায়।
স্বজনদের কান্না আর আহাজারির মধ্যে এখন একটাই দাবি সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে কোলকাতা থেকে তাদের প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দিক। শেষবারের মতো মুখটি দেখে, নিজ হাতে মাটি দিয়ে আপনজনকে বিদায় দিতে চান তারা।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ বলেন, ভারতের হাইকমিশন থেকে লাশ দুটো দ্রুত প্রেরণের ব্যবস্থা করছে তারা। পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেছেন।