সম্পাদকীয়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে নানা আলোচনা ও জল্পনা চললেও আপাতত সফরটি হচ্ছে না- এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের দ্বিপক্ষীয় সফর তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার পেছনে থাকে পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কিছু মৌলিক অমীমাংসিত বিষয়ে অগ্রগতির সম্ভাবনা। সেই পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত প্রথম থেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহের কিছু সংকেত দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ ছিল ইতিবাচক বার্তা। ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণও দুই দেশের যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সৌজন্য ও আমন্ত্রণের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানও জরুরি। বরং সেই সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া উচ্চপর্যায়ের সফর অনেক সময় প্রত্যাশিত ফলের বদলে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী দেশটি কেন বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরিতা শুরু করলো? তাদের পেয়ারের হাসিনাকে এই দেশের মানুষ উৎখাত করেছে। বাংলাদেশের জনমত ঘোর হাসিনাবিরোধী হলেও ভারত তাকে পেলে-পুষে রাখছে। আবার তাকে রাজনৈতিক বক্তব্যদানের সুযোগও করে দিচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরু থেকে ভারত ক্রমাগত বৈরী আচরণ করে গেছে।
এদেশের মানুষ যে ভারতের ‘দাদাগিরি’ পছন্দ করে না, তা দেশটির নেতারা বিলক্ষণ জানেন। তা সত্ত্বেও এখনও যদি তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক কার্যক্রম শুরু করেন, তাহলে এই দেশের মানুষও তা ভালোভাবে নেবে। কিন্তু ক্রমাগত বাংলাদেশের সঙ্গে ‘শত্রুতামূলক’ আচরণ চলতে থাকবে, আর দেশটির প্রধানমন্ত্রী জনমত উপেক্ষা করে দিল্লি সফর করবেন- ভারতের এই প্রাচীন কৌশল এখন অকার্যকর। ভারতকে মনে রাখতে হবে, এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীনরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত, কোনো রাতের ভোটে তারা ক্ষমতা করায়ত্ত করেননি। ফলে অভ্যন্তরীণ জনমত অবশ্যই এই সরকারকে মাথায় রাখতে হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় নিঃসন্দেহে সাবেক ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত একজন সাবেক সরকারপ্রধানের ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া ঢাকার জন্য যে অস্বস্তিকর, তা স্পষ্ট। বাংলাদেশ এ বিষয়ে ভারতের কাছে তার অবস্থান জানিয়েছে এবং প্রত্যর্পণের অনুরোধও করেছে। ফলে এ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফরকে স্বাভাবিক দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তুমুল জনপ্রিয় তরুণ প্রতিবাদী শরীফ ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলার অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণের প্রশ্ন। বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠিয়েছে এবং ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ ধরনের বিষয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইনগত স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এগুলোকে কেবল কূটনৈতিক দর-কষাকষির উপাদান হিসেবে না দেখে আইনের শাসন ও বিচারিক সহযোগিতার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সীমান্ত পরিস্থিতি। সীমান্তে প্রাণহানি, মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ, ভিসা জটিলতা কিংবা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও পানিবণ্টনের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিনের। এসব প্রশ্নে জনগণের প্রত্যাশা যেমন প্রবল, তেমনি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও বেশি। ফলে শুধু শীর্ষ পর্যায়ের সফর আয়োজন করলেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দৃশ্যমান অগ্রগতি তৈরি করাই বেশি জরুরি।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ একতরফা ছাড় দেওয়া নয়। একইভাবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ প্রতিবেশীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিরোধ সৃষ্টি করাও নয়। সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই বাংলাদেশের নীতির মূল ভিত্তি।
তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর কবে হবে, সেটি এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। বরং সফরটি যেন অর্থবহ হয়, সে জন্য কী কী অগ্রগতি প্রয়োজন- সেটিই হওয়া উচিত আলোচনার বিষয়। প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, ভিসা, বাণিজ্য, জ্বালানি ও পানিবণ্টনের মতো অমীমাংসিত ইস্যুতে যদি কিছু বাস্তব অগ্রগতি অর্জন করা যায়, তাহলেই কেবল প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা হতে পারে।