সম্পাদকীয়
যশোরের বিস্তীর্ণ বিলহরিণা জলাবদ্ধতার শিকার হওয়ায় সেখানে এখন ফসল ফলানো দায় হয়ে উঠেছে। কার্যত এই সংকট কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।
একসময় বিশাল এই বিলে প্রচুর ফসল ফলতো। আশপাশের গ্রামগুলোর চাষিদের মুখে ছিল হাসি; যা এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। দখল-দূষণে মুক্তেশ্বরী নদী ও ‘জিয়ার খাল’ নাব্য হারানোয় এবং পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এ দুর্ভোগের প্রধান কারণ বলে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সমস্যা সমাধান করতে পারেনি কোনো সরকার।
দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। হাজার হাজার বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকায় কৃষি উৎপাদন কমছে, কৃষকের আয় কমছে এবং অনেক পরিবার জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। অথচ যথাযথভাবে নদী ও খাল পুনর্খনন করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করা জরুরি। কিন্তু অদূরবর্তী ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশিত না হতে পারলে আসলে বিলহরিণার সংকট সমাধান করা সম্ভব হবে না- এটাও সত্য।
জলাবদ্ধতার পাশাপাশি দূষিত পানি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। শহরের প্লাস্টিক, পলিথিন ও হাসপাতালের বর্জ্য মিশ্রিত পানি বিলে গিয়ে পড়লে তা শুধু কৃষিজমির ক্ষতিই করে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি তৈরি করে। কৃষকদের চর্মরোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার অভিযোগ তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই কৃষকদের ওপর চাপানো যায় না।
অপরিকল্পিত পুকুর ও মৎস্যঘেরও পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত করছে- এমন অভিযোগও রয়েছে। কৃষিজমি রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের স্বার্থে এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি জরুরি। উন্নয়ন বা ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে যদি বৃহত্তর এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বহন করতে হয় পুরো জনগোষ্ঠীকে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। সংকটের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত সরকার এসেছে, তারা জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কাজও কিছু হয়নি, তা নয়। কিন্তু পরিবেশ-প্রতিবেশ ও স্থানীয় জনগণের হাজার বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকল্পগুলো তাৎক্ষণিক কিছু সুফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এমতাবস্থায় মুক্তেশ্বরী নদী ও ‘জিয়ার খাল’-এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ কারিগরি সমীক্ষা করা দরকার। কোথায় কতটা পলি জমেছে, কোন অংশ পুনর্খনন প্রয়োজন এবং পানি নিষ্কাশনের পূর্ণাঙ্গ পথ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়- তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হবে। এরপর দায়িত্বশীল দপ্তর প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান করবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা’ যে ব্যর্থ, তা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে ওই দপ্তরকে অবশ্যই প্রাচীন চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে।
একই সঙ্গে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে সেগুলো সরাসরি বিলে না যেতে পারে। কৃষিজমি ও জলাশয় দখল, ভরাট এবং অপরিকল্পিত মৎস্যঘের বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, শুধু খাল খনন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; পানি নিষ্কাশনের পুরো কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
বিলহরিণার এই অবস্থাকে শুধু কৃষকদের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করলে হবে না। জলাবদ্ধতা দূর হলে শুধু কয়েক হাজার কৃষক নিশ্চিতভাবেই উপকৃত হবে। তার চেয়ে বড় কথা বাড়বে কৃষি উৎপাদন, সুরক্ষিত হবে খাদ্যনিরাপত্তা এবং পুনরুজ্জীবিত হবে একটি সম্ভাবনাময় কৃষি অঞ্চল।