সম্পাদকীয়
বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে প্রকাশিত ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’ সরকারের প্রতি মানুষের মনোভাব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে একই সঙ্গে সতর্কবার্তামূলক চিত্র তুলে ধরেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ মানুষ মনে করেন প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন। সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকেও ৫৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সমর্থন থাকা নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
কিন্তু এই ইতিবাচকতার আড়ালে যে অস্বস্তিকর বাস্তবতা রয়েছে, সেটিই সরকারের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
কারণ প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সামগ্রিক জনপ্রিয়তার তুলনায় দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কঠিন। জরিপে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ৮৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং জ্বালানি ও গ্যাস নিয়ে ৭৯ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ নেতিবাচক মত দিয়েছেন। নিত্যপণ্যের দাম নিয়েও ৬৯ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ডকে খারাপ বলেছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা থাকলেও রাষ্ট্রের মৌলিক সেবা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের অসন্তোষ যথেষ্ট গভীর।
যদিও গ্যাস-বিদ্যুৎজনিক সংকট বাংলাদেশের বাস্তবতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে সরকার এই বিষয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখিয়েও খুবএকটা ভালো কিছু করতে পারবে না। এর বাইরে শেখ হাসিনা সরকারের সময় গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতকে লুটপাটের আখড়া বানানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকার সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এটা ইতিবাচক দিক। কিন্তু আমজনতা এতকিছু বুঝতে চান না। তারা চান, দ্রুত সংকটের সমাধান। আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা যারা সরকার পরিচালনা করছেন, তারা সবচেয়ে ভালো জানেন।
জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ৪৬ দশমিক ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। ভালো হয়েছে বলেছেন মাত্র ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির চাপ মানুষের ঘরে ঘরে কীভাবে পৌঁছেছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সামনে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে- এমন আশা অবশ্য ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই আশাবাদকে সরকারের নীতির পক্ষে একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে; সেই প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে বলে ৪৮ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষের মতও সরকারের জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু ভুল পথে যাচ্ছে মনে করেন ৩৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের প্রতি আস্থা আছে, কিন্তু সেই আস্থা এখনও অখণ্ড বা নিরঙ্কুশ নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যে মূল্যায়নের বড় পার্থক্য দেখায় যে রাজনৈতিক বিভাজন সমাজে এখনও বিদ্যমান। সরকারের উচিত বিরোধী মতকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য হিসেবে না দেখে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।
বিরোধীদলীয় নেতাদের নিয়ে মানুষের মূল্যায়নও সরকারের জন্য প্রাসঙ্গিক। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বিষয়ে ৩৯ দশমিক ৮০ শতাংশ ইতিবাচক মত দিয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দুজনের সম্পর্কেই যথেষ্ট জানেন না। এর অর্থ, সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে শুধু সরকার নয়, বিরোধী দলগুলোকেও নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট ও দৃশ্যমান করতে হবে।
নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সূচকগুলো তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ নিজেদের এলাকায় অন্ধকারে একা হাঁটাকে নিরাপদ মনে করেন এবং ৯৫ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ নিজেদের ধর্ম উন্মুক্তভাবে পালনে নিরাপদ বোধ করেন।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের প্রতি ৭৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং করনীতির প্রতি ৭০ দশমিক ৭০ শতাংশ মানুষের সমর্থন সরকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে জনসমর্থনকে প্রশাসনিক সক্ষমতায় রূপান্তর করতে না পারলে ভালো উদ্যোগও মানুষের আস্থা হারাতে পারে।
সব মিলিয়ে জরিপটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হলো, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রতি যে আস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি বড় রাজনৈতিক সম্পদ। একে ধরে রাখার একমাত্র পথ হলো মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধান করা। সরকারের সামনে তাই আত্মতুষ্টির নয়, কাজের সময়।
ছয় মাসের জরিপে যে আস্থার ছবি পাওয়া গেছে, সেটি সরকারের জন্য প্রশংসার চেয়ে বেশি একটি দায়িত্বের বার্তা। মানুষ যদি বলে সরকার ভালো করছে, তবে সেই প্রত্যাশার জবাব দিতে হবে আরও ভালো কাজের মাধ্যমে।