যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

তিন মাস পর সুন্দরবনের দুয়ার খুলছে

এম জুবায়ের মাহমুদ ও হুমায়ুন কবির

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
তিন মাস পর সুন্দরবনের দুয়ার খুলছে

ঘাটে সারি সারি নৌকা। কোনোটি মেরামত হচ্ছে, কোনো নৌকায় লাগানো হচ্ছে নতুন কাঠ। পাশে জাল সেলাইয়ে ব্যস্ত জেলেরা। কেউ নৌকায় তুলছেন জ্বালানি, চাল-ডাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। দীর্ঘ তিন মাসের নিস্তব্ধতা ভেঙে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে জীবিকার আশায় বনে ফেরার প্রস্তুতির পাশাপাশি জেলে-বাওয়ালিদের মনে রয়েছে বনদস্যুর আতঙ্ক।

তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) খুলছে সুন্দরবন। মাছ ও কাঁকড়া আহরণে নদী-খালে ফিরবেন জেলে-বাওয়ালিরা। একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্যও খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। দীর্ঘ বিরতির পর সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরা ও খুলনার জনপদে তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাছের প্রজনন ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিবছর জুন, জুলাই ও আগস্ট-এই তিন মাস বনে প্রবেশ এবং মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকে। গত ১ জুন থেকে কার্যকর হওয়া নিষেধাজ্ঞা আজ প্রত্যাহার হচ্ছে। এ সময়ে মাছ-কাঁকড়া আহরণনির্ভর পরিবারগুলোর অনেকেই আয় হারিয়ে ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন।

শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীর দাঁতিনাখালী গ্রামের জেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তিন মাস বনে যেতে পারিনি। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়েছে। এখন আবার বনে যেতে পারবো। আশা করছি, মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ঋণও শোধ করতে পারবো।’

কয়রার পাঁচ নম্বর গ্রামের জেলে মফিজুল ইসলাম প্রায় দুই যুগ ধরে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করেন। তিনি বলেন, বন বন্ধ থাকলে তার আয়ের আর কোনো পথ থাকে না। গত তিন মাস খুব কষ্টে কেটেছে, পর্যাপ্ত সহায়তাও পাননি। সংসার চালাতে ১ সেপ্টেম্বর থেকেই বনে নামতে হবে। তবে বনে গিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় চিন্তা।

বনজীবীরা জানান, একটি নৌকা নিয়ে বনে যেতে প্রস্তুতিতেই খরচ হয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। নৌকা মেরামত, নতুন জাল কেনা বা পুরোনো জাল মেরামত, জ্বালানি, চাল-ডালসহ খাবার, দড়ি, অন্যান্য সরঞ্জাম এবং পাস-পারমিটে এ অর্থ খরচ হয়। অধিকাংশ জেলের হাতে এ টাকা না থাকায় স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ধার নিতে হয়। বনে গিয়ে প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ-কাঁকড়া না পেলে লোকসানের সঙ্গে বাড়ে ঋণের বোঝাও।

এর মধ্যে বড় উদ্বেগ নিরাপত্তা। চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে একাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ‘ডন বাহিনী’ পরিচয়ে ১৯ জেলেকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। মে মাসে আরও আটজন এবং জুনের শুরুতে ছয় জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর বনে ফিরলেও দস্যু আতঙ্ক কাটছে না বনজীবীদের।

জেলেদের ভাষ্য, সুন্দরবনে কুমির, বাঘ ও বিষধর সাপের মতো প্রাকৃতিক ঝুঁকি সব সময়ই রয়েছে। এর সঙ্গে দস্যুদের অপহরণ ও মুক্তিপণের ভয় নতুন করে নিরাপত্তার বড় সংকট তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় দুর্গম এলাকায় দস্যুদের তৎপরতা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

বনজীবীদের দাবি, সুন্দরবনের নদী ও খালপথে নিয়মিত যৌথ টহল, বনদস্যু দমনে বিশেষ অভিযান এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি চান তারা। একই সঙ্গে বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট দুই হাজার ৯৩৮টি বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। এর মধ্যে মাছ আহরণের জন্য এক হাজার ১৪৮টি, কাঁকড়া আহরণের জন্য এক হাজার ৭০০টি, গোলপাতার জন্য দুটি, পর্যটকবাহী ট্রলারের জন্য ৭৪টি, লবণাক্ত পানির জন্য একটি এবং মধু আহরণের জন্য ১২টি বিএলসি রয়েছে। এ ছাড়া মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য আরও ৫০০টি ডিঙি নৌকা অনুমতি নিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে সুন্দরবনে অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতেও অভিযান চালিয়েছে বন বিভাগ। এ সময়ে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে ৫৫টি মামলা করা হয়েছে এবং ৫৫টি নৌকা জব্দ করা হয়েছে। ৪৪ জনকে আসামি করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে তিন হাজার ৮৫০ কেজি শামুক, একটি পিকআপ, এক হাজার কেজি মধু, ২৩০ কেজি সাদা মাছ, ১৩৫ কেজি চিংড়ি মাছ, চার বোতল বিষ এবং হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ২৭৮টি ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।

অন্যদিকে সুন্দরবন খুলে যাওয়ায় আশাবাদী পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। মুন্সিগঞ্জের পর্যটনবাহী ট্রলার ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘তিন মাস পর্যটক না থাকায় ব্যবসা প্রায় বন্ধ ছিল। এখন পর্যটক বাড়লে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রলার ও নৌযান ব্যবসা আবার সচল হবে।’

পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলে ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফরেস্ট স্টেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বনজ সম্পদ রক্ষা ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক সাজমিনুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত নিয়ম ও বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জেলে-বাওয়ালিরা মাছ-কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটকেরা সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবেন। বনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সবাইকে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)