যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

নয় টাকার চারা রোপণে ৫০০ টাকা খরচ!

আনোয়ার হোসেন

, মণিরামপুর (যশোর)

প্রকাশ : সোমবার, ৩১ আগস্ট,২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
নয় টাকার চারা রোপণে ৫০০ টাকা খরচ!

যশোরের মণিরামপুরে সরকারিভাবে দুটি খাল খননের পর বৃক্ষরোপণ প্রকল্পে নিম্নমানের চারা রোপণ করে টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) দপ্তরের বিরুদ্ধে।

উপজেলার মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খাল পুনর্খননের পর তীরে ১৪০টি চারা রোপণে যে অর্থ খরচ দেখানো হয়েছে, তার অর্ধেকেরও কম ব্যয় করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি দুই ইউপি সদস্যের নিজ দায়িত্বে বরাদ্দের অর্থে চারা রোপণের কথা থাকলেও পিআইও দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেন নামমাত্র দামে চারা কিনে রোপণ করে বরাদ্দের অর্ধেক টাকা হাতিয়েছেন।

উপজেলা বন বিভাগে যে চারা মাত্র নয় টাকায় পাওয়া যাচ্ছে তার চেয়েও নিম্নমানের চারা ৫০ টাকায় ক্রয় দেখিয়ে তাতে বাঁশের (চাঁচ) বেড়া ও নেট ঘিরে প্রতিটি চারায় ৫০১ টাকা খরচ দেখিয়েছেন সরোয়ার হোসেন। যদিও সরেজমিন দুই খাল ঘুরে বেশ কয়েকটি চারা, চাঁচের বেড়া ও নেটের হদিস মেলেনি।

প্রকল্পের সভাপতি দুই ইউপি সদস্যর দাবি, পিআইও দপ্তরের সরোয়ার হোসেন চারা কেনাসহ রোপণ, সব কাজ করিয়েছেন। আমরা শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেছি।

তবে চারা কেনার বিষয়ে সরোয়ার হোসেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সেলিম খানকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, সরেজমিন নার্সারিতে না গিয়ে মোবাইলফোনের মাধ্যমে ভোজগাতী এলাকা থেকে পিআইও ৪০-৫০ টাকা দরে চারা কিনেছেন।

আর পিআইও সেলিম খানের দাবি, চারা কেনা থেকে রোপণ সব কাজ প্রকল্পের সভাপতিরা করেছেন। সরোয়ার হোসেন তাদের সহযোগিতা করেছে। পরে সে আমাকে খরচের একটা হিসাব দিয়েছে।

পিআইও দপ্তরের দেওয়া সূত্রমতে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গত মে-জুন মাসে মণিরামপুর উপজেলার মশ্মিমনগর ও মোবারকপুরে দুটি খাল পুনর্খননের জন্য ৩৯ লাখ ২৫ হাজার ৫০২ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী খাল কাটা শেষে ৭০ হাজার ১৯৬ টাকায় মশ্মিমনগর খালে ৯০টি ও মোবারকপুর খালে ৫০টি চারা রোপণ করা হয়েছে। যারমধ্যে অর্জুন, আমলকী, জাম ও আমড়ার চারা রয়েছে। প্রতিটি চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০১ দশমিক ৪০ টাকা।

পিআইও দপ্তরের দাবি, ৫০০ টাকার মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাদ দিয়ে ৫০ টাকা দরে চারা কিনে প্রতিটি চারা রক্ষায় ১২০ টাকায় বাঁশের খাঁচা, ৫০ টাকায় বাঁশের খুঁটি, ৭৫ টাকার নেট, ১৭ টাকা পরিবহন খরচ ও তিন মাসের পরিচর্যায় ১৫০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

যদিও উপজেলা বন বিভাগ নোটিস ঝুলিয়ে নয় টাকা দরে আমলকী, অর্জুন ও জামের চারা বিক্রি করছেন। যা পিআইও দপ্তরের কেনা চারা থেকে অনেক ভাল মানের।

সেই হিসেব অনুযায়ী যে চারা বনবিভাগ থেকে মাত্র এক হাজার ২৬০ টাকায় কেনা যেতো তার থেকেও নিম্নমানের চারা সাত হাজার টাকায় ক্রয় খরচ দেখিয়েছে পিআইও দপ্তর।

দিকে গত বুধবার সরেজমিন উপজেলার মশ্মিমনগর খাল ঘুরে পিআইও দপ্তরের দেওয়া তথ্যের সাথে মিল পাওয়া যায়নি। মোবারকপুর খালে তারা ৫০টি চারা রোপনের কথা বললেও বাস্তবে ৫টি চারার হদিস পাওয়া যায়নি। পিআইও দাবি করেছেন, খাঁচাসহ পাঁচটি চারা চুরি হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।

আর মশ্মিমনগর খালপাড়ে কয়েকটি খাঁচায় চারার কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। কয়েকটিতে পাওয়া গেছে মৃত চারা। কোনটিতে নিম্নমানের চারা পাওয়া গেলেও পাওয়া যায়নি নেট ও খুঁটির অস্তিত্ব।

পিআইও দপ্তর বাঁশের খুঁটির পিছনে সাত হাজার টাকা, নেট কেনার পিছনে ১০ হাজার ৫০০ টাকা ও খাঁচা কেনার পিছনে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয় দেখালেও সরেজমিন ঘুরে তার পুরোটার সত্যতা মেলেনি।

পিআইও দপ্তর ১৪০টি চারা পাহারায় তিন মাসে ২১ হাজার টাকা খরচের বরাদ্দের কথা বলেছে। সে হিসেবে চারা পরিচর্যায় মাসে সাত হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

তবে, মশ্মিমনগর খাল পাড়ের চারা পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত আব্দুল আলীম ও মোবারকপুর খাল পাড়ের চারা পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত মতিয়ার রহমান একমাসে পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে কথা হয় মোবারকপুর খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি ও সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য হালিমা খাতুনের সাথে। তিনি বলেন, চারা, নেট, খাঁচা সব সরোয়ার ভাই কিনেছেন। আমি শুধু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছি। একই কথা বলেছেন মশ্মিমনগর খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি সনৎ দত্ত।

কে এই সরোয়ার

অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) ৪০ দিনের কাজ তদারকির জন্য প্রকল্পে নিয়োগ পেয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে ২০১৬ সালের দিকে মণিরামপুরে যোগদান করেন সরোয়ার হোসেন। সেই থেকে একই স্থানে কাজ করছেন তিনি। তিন বছর আগে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে তা আর বৃদ্ধি করেনি সরকার। চাকরি হারালেও দপ্তর ছাড়েননি সরোয়ার। কাগজে-কলমে তিনি দপ্তরের কেউ না হয়েও মণিরামপুর পিআইও দপ্তরে বহাল তবিয়তে আছেন। তাকে দিয়ে টিআর কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের সভাপতিদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করে পিআইও অফিস। আর সেখান থেকে তিনি মাসোহারাসহ মাসিক পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন বলে সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে মণিরামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সেলিম খান বলেন, প্রকৃতপক্ষে গাছের চারার দাম একটু বেশি হয়েছে। উপজেলা বন বিভাগে নয় টাকায় চারা পাওয়ার বিষয়টি জানা ছিল না। চারাগুলো দেখভালের জন্য তিন মাসের জন্য দু’জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও দু’দিন চারা দেখে এসেছি।

পিআইও বলেন, প্রকল্পের সভাপতিদের তিন মাসপর ১৪০টি গাছ সতেজ অবস্থায় বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কোনো গাছ মারা গেলে বা ক্ষতি হলে তা নিজ খরচায় পিআইসি সভাপতি লাগিয়ে দিবেন।

সরোয়ার হোসেনের বিষয়ে পিআইও সেলিম খান বলেন, ২০২৪ সালের জুন মাসে আমাদের ইজিপিপি প্রকল্প শেষ হয়। সেই থেকে তাদের বেতন বন্ধ আছে। চাকরি স্থায়ী হওয়ার জন্য সরোয়ার হোসেনরা মামলা করেছেন।

সেলিম খান আরও বলেন, মাস্টার রোলে প্রকল্পের সভাপতিদের সহযেগিতা করেন সরোয়ার। সেখান থেকে যা পান তা দিয়ে নিজের খরচ মেটান।

মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, খাল পাড়ে চারা লাগানোর কাজ পিআইও দপ্তর করেছে। চারা দেখতে আমি সরেজমিন যাবো।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)