আমরা রাতের মহিষকে দিনে গরু বানাতে ওস্তাদ। এর সঙ্গে আর্থিক বিষয় জড়িত বলেই আমাদের দেশের পেশাদার কসাইকুল এই কর্মটি অতীব দক্ষতার সঙ্গে করেন। অবশ্য একই সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হলে পাবলিক চকচকে দেখে মহিষের মাংসের দিকেই নজর দেয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কসাইকুল আর বেশিরভাগ আমজনতা সম্ভবত এটা জানেন না যে গরুর মাংসের চেয়ে মহিষের মাংস অধিকতর পুষ্টিকর। কারণ এতে চর্বি ও কোলেস্টরেলের পরিমাণ কম থাকে।
মূল প্রসঙ্গে ফিরছি। প্রথমে একটি ইতিবাচক সংবাদের পুনরাবৃত্তি করেই মহিষবন্দনা শুরু করছি। বিশ্বে মহিষের প্রথম ক্লোন করেছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিজ্ঞানীরা। বাছুরটির নাম ছিল ‘সামরুপা’। হজমে ব্যাঘাত ঘটায় এটা এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়। এর পর ‘গরিমা’ নামে আরেকটি ক্লোন-মহিষও তারা তৈরি করেন।
আফ্রিকান, অস্ট্রেলিয়ান ও এশিয়ান মহিষের মাঝে স্বভাবগত কিছু ব্যবধান রয়েছে। এশিয়ান মহিষ হচ্ছে ওয়াটার বাফেলো (জলমহিষ কি বলা যায়?) বেশিরভাগ সময় পানিতেই কাটায়। ডানপিটে গ্রাম্য ছেলের মতো পানিতে নামলে উঠতে ভুলে যায়। অন্য মহিষও পানিতে নামে। অন্তত পানির কাছাকাছিই অবস্থান নেয়। কিন্তু খাঁটি ‘জলমহিষের’ মতো পানিতে সব সময় খেলা করে না।
বিশ্বে ৭৪ প্রজাতির ‘জলমহিষ’ থাকলেও বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, লাওস, ভারতের আসাম ও উড়িষ্যার মহিষ মূলত একই প্রজাতির। এ গ্রহবাসী নাকি পাঁচ হাজার বছর আগে মহিষের ঘাড়ে জোয়াল চাপাতে পেরেছিল। সেই জোয়াল এখনও নামাতে পারেনি মহিষরা।
গরিব ভিয়েতনামিদের কাছে এটা এখনও ‘ট্রাক্টর’ হিসেবে পরিচিত। শুধু তাই নয়, এখনও তারা মহিষকে পরিবারের সদস্যই ভাবে। ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত ২২তম সাউথ ইস্ট এশিয়ান গেমসের মাসকট ছিল মহিষের।
মোষ সংস্কৃত শব্দ। এটা থেকে বাংলায় মহিষ শব্দটি এসেছে। সংস্কৃতে মোষ শব্দের মূল ‘মহ্’ ধাতু। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাণীটি জলে নামলে উঠতেই চায় না, আবার জলে নামলেই যেন উৎসবে মেতে ওঠে। এ কারণে এটার নাম হয়েছে মোষ। তবে সংস্কৃতে মোষ শব্দটি খুব একটা প্রচল নয়। যদিও শব্দটির দেখা মেলে ঋগে¦দে। সংস্কৃতে মোষের প্রতিশব্দ হিসেবে রয়েছে লুলাপ, কৃষ্ণশৃঙ্গ, যমবাহন, সৈরিভ ও কাসর।
এটা ঠিক, সংস্কৃতে মহিষের প্রতিটি প্রতিশব্দের রয়েছে আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা, যা মহিষের আচার-আচরণ প্রত্যক্ষণের দলিল। যেমন সংস্কৃত ‘লুল’ ধাতু থেকে আসা লুলাপ শব্দটি বেশ তাৎপর্যবহ। কারণ ‘লুল’ মানে মর্দন। জল ছিটিয়ে ডলাই-মলাই করলে মহিষ একেবারে শান্ত-সুবোধ বালকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই লুল ধাতুর সঙ্গে ‘অলপ’ প্রত্যয় যোগে তৈরি হয়েছে ‘লুলাপ’।
বাংলা ভাষায় প্রচলিত সংস্কৃত ‘গড়িমসি’ শব্দের সঙ্গে অনেকে মহিষের স্বভাবের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে গড়িমসি শব্দের দুটি গঠন নির্দেশ করা হয়েছে। সংস্কৃত গড়+ই+মসি অথবা সংস্কৃত গো>গর+ই+ সংস্কৃত মহিষ>মসি। অথচ মূলে রয়েছে ‘পশুর আলস্যভাব’। পশুর এ আলস্য ভাব এখন মানুষের প্রতিও পুরোপুরি প্রযুক্ত হচ্ছে। সংস্কৃত ‘গড়ি’ মানে অলস গবাদি। গড়ি শব্দের সঙ্গে ‘মইষি’ যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে গড়িমইষি। আর গড়িমইষি থেকে হয়েছে গড়িমষি। পরে মষি বানানটি মসি হয়ে যাওয়ায় গড়িমসিতে দুষ্ট মহিষের আলস্যভাবটিও চোখের আড়ালে চলে গেছে।
অবশ্য গড়িয়া (সংস্কৃত গড়+বাংলা ইয়া) মানে ‘দুষ্ট বৃষের ন্যায় অলস’। ওড়িয়া ভাষায় গড়িমসির সমমানের শব্দ হচ্ছে গড়-মষন। আবার ‘গতর-গড়িয়া’ বলতে এক সময় ‘শারীরিক শ্রমকাতর’ বোঝাতো।
মহিষের জলপ্রীতির আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে ‘কাসর’ শব্দটি। সংস্কৃত ‘ক’ শব্দের অনেক অর্থের মাঝে একটি অর্থ হচ্ছে জল। আর মহিষ জল দেখলেই ছুটে যেতে চায় বলে এটার নাম হয়েছে কাসর। সংস্কৃত ‘ক’ শব্দটি দিয়ে বাতাসও বোঝায়। যেমন, কপোত। অর্থাৎ ‘যা বাতাসে পোত বা নৌকার মতো ভেসে থাকে’।
হিন্দুধর্মের সঙ্গে মহিষ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কারণ সূর্যদেব ও বিশ্বকর্মার মেয়ে সজ্ঞার ছেলে যমরাজ বিমাতার অভিশাপে দুর্বল পায়ের অধিকারী হন। পরে দেবতারা প্রীত হয়ে যমরাজের জন্য ‘পৌণ্ড্রিক’ নামে এক মাদী মহিষ নিযুক্ত করেন। ব্যস! মহিষ হয়ে গেল যমরাজের বাহন। আর মহিষ হলো ‘যমবাহন’।
বুনো মহিষ দল বেঁধে চলে। এরা খুবই হিংস্র। বাঘও তাদের ভয় পায়। তবে মওকা পেলে ঘাড় মটকায়।
যার শিং যত বড়, সেই তত মহান। যার শিং যত মোটা সেই তত বড় পালোয়ান। মহিষকুলের কী নেই? আছে বিশাল ভুঁড়ি, বিশাল দেহ, বড়সড় মোটা শিং, চরিত্র মানুষের উপকার করা, মাঝে মাঝে কাঁচা-পাকা ফসলের ক্ষেতে ছেড়ে দিলে তা খেয়ে ধ্বংস করা। আপনারা সিংহকে বলেন পশুর রাজা, আর বাঘকে বলেন বনের রাজা। অথচ বাঘ, সিংহের কেউ মানুষের এত প্রত্যক্ষ উপকার করে না।
এমনিতেই মহিষকুল খুব বিনয়ী, অকারণে কাউকে গুঁতা মারে না, ক্ষুধা লাগলেও দড়ি ছিঁড়ে ক্ষেতের ফসল ধ্বংস করে না, পাশ দিয়ে গেলে লাথিও মারে না।
তবে বাংলাদেশে মহিষ এখন বিপন্ন প্রাণীর কাতারে চলে গেছে। প্রাণিবিজ্ঞানীদের কেতাবি ভাষায় ‘মহিষ এখন প্রান্তিক পশু’।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পশুসম্পদ অধিদফতরের হিসাব মতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে মহিষের সংখ্যা ছিল দশ লাখ ৩০ হাজার। আর পশুসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব মতে, বর্তমানে দেশে মহিষের সংখ্যা প্রায় আট লাখ। এর মধ্যে দেশে জš§ানো মহিষের সংখ্যা অনেক কম। পূর্ণবয়স্ক মহিষের বড় অংশই ভারত থেকে আমদানি করা। অথচ মহিষ পালতে খরচ অনেক কম।
মহিষের সঙ্গে আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিপর্যয়ের করুণ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এক সময় দেশটির সমতল ভূমিতে চষে বেড়াতো লাখ লাখ মহিষ। ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের নজর যায় ওই সমতল ভূমির দিকে। তারা উপলব্ধি করে ‘ক্যাটল ব্যারন’ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে নয়া আবিষ্কৃত শার্প রাইফেল দিয়ে মহিষ-বধ পর্ব আগে সারতে হবে। মহিষ হটলে আদিবাসীদের জীবনধারাও পাল্টাবে। সময়ের ব্যবধানে বসতি স্থাপনকারীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন রাজনীতিবিদ আর সেনা কর্মকর্তারা।
সতর্ক অধ্যবসায়ে ক্যাটল ব্যারনরা এই অপকর্মটি সারতে পেরেছিলেন বলে মহিষ আর সমতলের আদিবাসীরা একদিন সংখ্যালঘু হয়ে যায়। বসতি স্থাপনকারীরা ‘র্যাঞ্চার’ নামে চুটিয়ে গরুর ব্যবসায়ে নেমে পড়েন। সমাজতাত্ত্বিকরা এটাকে ‘ডার্টি বিজনেস’ আখ্যা দিলেও র্যাঞ্চাররা তা গায়ে মাখেননি।