রাসেল মাহমুদ
, যশোর
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাজার শরীফ। ইতিহাস, লোককথা ও জনশ্রুতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ মাজারে দিন দিন ভক্ত ও দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ছে।
গাজী-কালু-চম্পাবতীর পরিচয় ও তাদের জীবনকাহিনি নিয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থানীয় মানুষের কাছে মাজারটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিত।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, বিরাটনগরের শাসক দরবেশ শাহ সিকান্দারের পুত্র ছিলেন গাজী। কালু ছিলেন শাহ সিকান্দারের পোষ্যপুত্র। কালু গাজীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সর্বত্র তাকে অনুসরণ করতেন।
অন্যদিকে, ছাপাইনগরের সামন্ত রাজা রামচন্দ্র ওরফে মুকুট রাজার কন্যা ছিলেন চম্পাবতী।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, পরীদের মাধ্যমে গাজী ও চম্পাবতীর পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু ধর্মীয় ও সামাজিক পার্থক্য তাদের এ সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
বিষয়টি জানতে পেরে মুকুট রাজা তার সেনাপতিদের গাজী ও কালুকে শায়েস্তা করার নির্দেশ দেন। এরপর কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এসব যুদ্ধে মুকুট রাজার সেনাপতি দক্ষিণা রায় পরাজিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং গাজীর অনুসারী হন।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুকুট রাজা ঝিনাইদহ, কোটচাঁদপুর, বারোবাজারের পূর্বাঞ্চল ও বেনাপোল এলাকার সামন্ত শাসক ছিলেন। অন্যত্র তিনি রামচন্দ্র বা শ্রীরাম নামেও পরিচিত ছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
মুকুট রাজার চারটি বাড়ি ছিল, ঝিনাইদহের বাড়িবাথান, বারোবাজারের ছাপাইনগর (বর্তমানে বাদুরগাছা), কোটচাঁদপুরের জয়দিয়া বাঁওড়ের বলরামনগর এবং বেনাপোলের কাগজপুকুরে।
গাজীর অনুসারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে মুকুট রাজা চম্পাবতীকে নিয়ে ঝিনাইদহের পাগলাকানাই ইউনিয়নের বাড়িবাথানে চলে যান। গাজীও তাকে অনুসরণ করেন। ঝিনাইদহে গিয়ে গাজী রাজার সেনাপতি গয়েশ রায়ের প্রমোদভবন জালিবল্লা পুকুরের পাশে বদমতলীতে অবস্থান নেন। সেখানেও গাজীর একটি মাজার রয়েছে বলে জানা যায়।
পরে মুকুট রাজা জয়দিয়া বাঁওড়ের বাড়িতে চলে যান। স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, জয়দিয়া বাঁওড় একসময় ভৈরব নদের অংশ ছিল। বাঁওড়ের পূর্ব পাড়ে ছিল রাজার বাড়ি। এর প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে রয়েছে বলুহর বাঁওড়, যা একসময় কপোতাক্ষ নদের অংশ ছিল। দুই বাঁওড় তথা দুই প্রাচীন নদীপথের মধ্যবর্তী এ রাজবাড়ির অবস্থানকে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
জয়দিয়া বাঁওড়ের দক্ষিণ পাড়ে তমালগাছের নিচে আজও গাজীর একটি দরগা রয়েছে। চম্পাবতীর টানে গাজী সঙ্গী কালুকে নিয়ে এখানেও এসেছিলেন।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, কয়েক দফা সংঘর্ষের পর গাজী তার অনুসারীদের নিয়ে মুকুট রাজার কাছ থেকে চম্পাবতীকে উদ্ধার করে বারোবাজারে ফিরে আসেন। কিন্তু গাজীর পিতা শাহ সিকান্দার বিষয়টি মেনে নেননি। একইসঙ্গে তৎকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় বিরোধের কারণে গাজীকে বাড়িতে উঠতে দেওয়া হয়নি।
এরপর গাজী দরবেশের বেশে চম্পাবতীকে সঙ্গে নিয়ে বাদাবনের দিকে চলে যান। তার সঙ্গী ছিলেন কালু ও দক্ষিণা রায়। সে সময় নাভারণ, বেনাপোল, সাতক্ষীরা ও বনগাঁর বিস্তীর্ণ অঞ্চল বনভূমিতে আবৃত ছিল।
কথিত আছে, গাজী ওই বনাঞ্চলে আস্তানা গড়ে তোলেন। স্থানীয় কাঠুরিয়া ও সাধারণ মানুষ তার অনুসারী হয়ে ওঠেন। এভাবেই গাজীকে ঘিরে নানা কাহিনি ও লোকবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
গাজীর পরিচয় ও সময়কাল নিয়েও বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। একটি ঐতিহাসিক বর্ণনায় এ কাহিনির সময়কাল পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ বলে উল্লেখ করা হয়। হোসেন শাহের শাসনামল ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ সাল পর্যন্ত বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তবে, গাজী-কালু-চম্পাবতীর কাহিনির সঙ্গে এসব ঐতিহাসিক চরিত্র ও সময়ের যোগসূত্র নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
গাজী-কালু-চম্পাবতীকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত। এসব কাহিনি লোকসংস্কৃতি ও স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাজারে পাশাপাশি তিনটি কবর রয়েছে। স্থানীয়ভাবে মাঝের বড় কবরটি গাজীর, পশ্চিমেরটি কালুর এবং পূর্বের ছোট কবরটি চম্পাবতীর বলে পরিচিত। মাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে রয়েছে একটি প্রাচীন বটগাছ। বটগাছটির নিচে একটি শূন্যস্থান রয়েছে, যেটিকে স্থানীয়দের কেউ কূপ, আবার কেউ অন্য কোনো প্রাচীন কবরের অংশ বলে মনে করেন।
১৯৯২ সালে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তিনটি কবর বাঁধাই করে বেষ্টনী প্রাচীর নির্মাণ, একইসঙ্গে খাদেমদের থাকার জন্য একটি সেমিপাকা টিনশেড নির্মাণ করা হয়। মাজার এলাকায় গাজী-কালু-চম্পাবতীর পাশাপাশি দক্ষিণা রায়ের কবরও রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত।
গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাজারকে ঘিরে যতই কিংবদন্তি ও লোককথা থাকুক, এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় সম্প্রীতির উপস্থিতি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে আসেন, মানত করেন এবং মাজারের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
প্রতিবছর ওরশ উপলক্ষে মাজার প্রাঙ্গণে হাজারো মানুষের সমাগম হয়। ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এ স্থানটি তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি বারোবাজারের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।