শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
যশোর শহরের দড়াটানা থেকে হাসপাতাল মোড়-ব্যস্ত সড়কের ব্রিজের ফুটপাতে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসছে মেঠো শাকসবজির বাজার। ডুমুর, কচুশাক, থানকুনি পাতা, কচুর ডাটা, ওলের ডাটা, কলার মোচা, কচুর ফুল, কলমি শাক, শাপলা, চালকুমড়ার শাকসহ নানা ধরনের দেশি শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ৩০ টাকায়। শহরের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব কিনছেন।
২৩ বছর ধরে ফুটপাতে শাকসবজি বিক্রি করছেন শাহেরা খাতুন। তার স্বামী রিকশা চালান। সংসারে স্বামীর আয় দিয়ে খরচ চালানো কঠিন হওয়ায় তিনি এই পেশায় যুক্ত হন। তার ভাষায়, ২০০৩ সালে যখন তিনি এখানে বসতেন, তখন এক আঁটি শাক বিক্রি করতেন মাত্র ২ টাকায়। তখন তার প্রধান ক্রেতা ছিলেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এখন সেই চিত্র বদলেছে।
শাহেরা খাতুন বলেন, আগে গরিব মানুষই বেশি কিনতো। এখন বড়লোকরাও গাড়ি থেকে নেমে শাকসবজি কিনে নিয়ে যায়। তারা দামদর করে না এবং ভাঙতি টাকাও ফেরত নেয় না।
ফুটপাতের আরেক বিক্রেতা ললু শেখ বিক্রি করছেন মিষ্টি কুমড়া, আমড়া ও লাল শাক। মিষ্টি কুমড়া কেজি ৩০ টাকা, আমড়া কেজি ২০ টাকা এবং রাল শাক ১০ টাকা আঁটি। তার দৈনিক বিক্রি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। মাসে ৩০ দিন বিক্রি করতে পারলে মোট বিক্রির অঙ্ক দাঁড়ায় ১২ হাজার থেকে ১৫হাজার টাকা। ললু শেখের পাশে বসেন নাজির শংকরপুর এলাকার আল-আমিন। তার কাছে দেশি মাছের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। জাপানি মিনার কাপ মাছ কেজি ১৫০ টাকা, গ্লাসকার্প ১০০ থেকে ১২০ টাকা, সিলভারকার্প ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং ট্যাংড়া মাছ ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি। একইসঙ্গে কচুর ফুল ১০ টাকা আঁটি, চালকুমড়ার শাক ২০ টাকা আঁটি, কলমি শাক ১০ টাকা আঁটি এবং কলার মোচা ৩০ টাকা পিস দরে বিক্রি করছেন।
এরশাদ মিয়ার কাছে রয়েছে বাদাবি লেবু, নারিকেল, পাকা কলা, কলার মোচা, পেঁপে ও আমড়া। বাদাবি লেবু মানভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকা পিস, নারিকেল ৮০ থেকে ১০০ টাকা, অমৃতসাগর কলা ৬০ টাকা ডজন, কলার মোচা ২০ থেকে ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ থেকে ৪০ টাকা এবং আমড়া ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি ধরনের পসরা সাজিয়ে বসেছেন চাঁদপাড়া এলাকার আকরাম হোসেন। কচুর ডাটা, ওলের ডাটা, শাপলা, মিষ্টি কুমড়ার শাক, কচুর ফুল, কচুর শাক, পুঁইশাক ও থানকুনি পাতা। এসবের বেশিরভাগই ২০ টাকা আঁটি।
ঘোপ সেন্ট্রাল রোড এলাকার নুর নাহারের কাছে রয়েছে কলমি শাক, সানচি শাক, লোঞ্চি শাক, কচুর ফুল, কচুর লতি ও কাটা কচু। আর শহরতলীর ছোট শেখহাটি জামরুলতলা এলাকার নাজমা বেগম স্বামীর কৃষিকাজের আয়ের পাশাপাশি সংসারে বাড়তি আয় করতে এই বাজারে বসছেন। তার তিন সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি এই কাজ করছেন। তার দৈনিক আয় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা বলে জানান তিনি।
এখানে কিনতে আসা গৃহবধূ হাবিবা সুলতানা বলেন, প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত মসলা দেওয়া খাবারের তুলনায় প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এসব শাকসবজি তার কাছে বেশি পছন্দের। ১০ থেকে ২০ টাকায় অল্প পরিমাণ শাক কেনা যায়। এতে খরচও কম হয়, আবার গ্রামের সেই পরিচিত দেশি খাবারও পাওয়া যায়।
তবে, ফুটপাত ব্যবহার নিয়ে শহর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও রয়েছে। জেলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান মিঠু মনে করেন, পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত না করে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে নির্দিষ্ট জায়গায় বসার সুযোগ দিলে একদিকে তাদের জীবিকা বজায় রাখা সম্ভব, অন্যদিকে ফুটপাতও সুশৃঙ্খল রাখা যায়। পণ্যগুলোর পরিচ্ছন্নতা, ওজন, দাম এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন।