যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পাটকাঠি যখন বাড়তি আয়ের উৎস

রূপক মুখার্জি

, লোহাগড়া (নড়াইল)

প্রকাশ : সোমবার, ২৪ আগস্ট,২০২৬, ১২:০০ পিএম
আপডেট : রবিবার, ২৩ আগস্ট,২০২৬, ১১:৪২ পিএম
পাটকাঠি যখন বাড়তি আয়ের উৎস

একসময় পাটের আঁশ ঘরে তোলার পর মাঠে পড়ে থাকা পাটকাঠিকে কৃষকেরা প্রায়ই বাড়তি বোঝা মনে করতেন। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া এর তেমন কোনো মূল্য ছিল না। অনেকের বাড়ির আঙিনায় স্তূপ করে রাখা পাটকাঠি পচে নষ্ট হতো, আবার কোথাও কোথাও ফেলে রাখা হতো অবহেলায়। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র।

নড়াইলে এখন পাটকাঠি আর ফেলনা নয়; এটি কৃষকের বাড়তি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ঘরের বেড়া, পানের বরজ, জ্বালানি ও বিভিন্ন নির্মাণকাজের পাশাপাশি শিল্পকারখানায়ও বাড়ছে এর ব্যবহার। এমনকী পাটকাঠি পুড়িয়ে তৈরি ছাই থেকে আহরিত কার্বন বিভিন্ন শিল্পপণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সেই কার্বনের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে দেশ-বিদেশে বেড়েছে পাটকাঠির কদর।

চিত্রা, নবগঙ্গা, কাজলা ও মধুমতী নদীবিধৌত নড়াইল একটি কৃষিনির্ভর জেলা। ধান ও পাট এ জেলার প্রধান ফসল। সোনালি আঁশখ্যাত পাট চাষের জন্য নড়াইলের পরিচিতি ও সুনাম দীর্ঘদিনের।

চলতি মৌসুমে জেলায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকেরা এখন পাট শুকিয়ে আঁশ ঘরে তুলছেন এবং ভালো দামে বিক্রি করছেন। একই সঙ্গে পাটকাঠিও রোদে শুকিয়ে যত্ন করে সংরক্ষণ করছেন, যাতে পরে চড়া দামে বিক্রি করা যায়। জেলার গ্রামাঞ্চলে এখন যেদিকে চোখ যায়, কৃষকদের পাটকাঠি শুকানো ও সযত্নে স্তূপ করে রাখার ব্যস্ততা চোখে পড়ে।

একসময় পাটকাঠিকে বোঝা মনে করা হলেও এখন কৃষকেরা সোনালি আঁশের পাশাপাশি ‘রুপালি কাঠি’ বিক্রির স্বপ্ন দেখেন। কারণ পাটকাঠির বাজারমূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহারও বহুমুখী হয়েছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষকেরা জমি থেকে পাট কাটার কাজে ব্যস্ত। অনেক জমির পাট ইতিমধ্যে কেটে পানিতে জাগ দেওয়া হয়েছে। আঁশ ছাড়িয়ে বিক্রির পর এখন চলছে পাটকাঠি শুকানোর কাজ। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে এবং বাড়ির উঠানে সারি সারি পাটকাঠি শুকাতে দেওয়া হয়েছে। শুকানো শেষে আটি বেঁধে বাড়ির আঙিনায় স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।

এসব পাটকাঠি পানের বরজে, ক্ষেতের চারপাশে বেড়া দিতে, গরুর ঘর ও রান্নাঘরের বেড়া তৈরিতে এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কয়েক বছর আগেও জেলার অধিকাংশ কৃষক মনে করতেন, পাটকাঠির একমাত্র ব্যবহার জ্বালানি। ফলে এর আলাদা কোনো বাজারমূল্য ছিল না। কিন্তু বিশ্ববাজারে পাটকাঠির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও এর দাম বেড়েছে। এখন অনেক কৃষক পাটের কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলেও পাটকাঠি বিক্রি করে সেই ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি আটি পাটকাঠি দশ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

লোহাগড়া উপজেলার আমাদা গ্রামের পাটচাষি টিপু সরদার বলেন, ‘কয়েক বছর আগে পাটকাঠি বাড়ির আঙিনায় পচে নষ্ট হতো। এখন এর ব্যাপক চাহিদা। ভালো দাম পাওয়ায় আমরা খুশি।’

একই উপজেলার জয়পুর গ্রামের কৃষক শওকত বলেন, ‘আগে ফেলনা পাটকাঠির কোনো কদর ছিল না, তাই ফেলে দিতাম। এখন এটা সোনার হরিণ। যত সময় নিয়ে বিক্রি করা যায়, তত লাভবান হওয়া যায়।’

লোহাগড়া শহরের পোদ্দারপাড়া এলাকার অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা রঘুনাথ কর বলেন, পাটকাঠি এখন আর ফেলনা নয়। পাটের পাশাপাশি এটিও উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি জানান, মুকসুদপুর উপজেলার বাটিকামারী ইউনিয়নের চারকোলা মিলে পাটকাঠি পুড়িয়ে ছাই তৈরি করা হয়। সেই ছাই থেকে আহরিত কার্বন পেপার, কম্পিউটার প্রিন্টারের কালি, ফটোকপির কালি, আতশবাজি, মোবাইল ব্যাটারি, প্রসাধনী পণ্য, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের মাজন এবং সার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ছাই থেকে বের হওয়া কার্বনের একটি অংশ বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। এ কারণেই দেশ ও বিদেশে পাটকাঠির চাহিদা বেড়েছে।

নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ছয় হাজার ৯৪২ হেক্টর, লোহাগড়ায় ১২ হাজার ১৬৫ হেক্টর এবং কালিয়া উপজেলায় চার হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।

এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। ফলে জেলায় বিপুল পরিমাণ পাটকাঠি পাওয়া যাবে এবং তা বিক্রি করে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, ‘পাট উৎপাদনে দেশের মধ্যে নড়াইল জেলার সুনাম ও ঐতিহ্য রয়েছে। এবার পাটের পাশাপাশি পাটকাঠি বিক্রি করেও কৃষকেরা লাভবান হবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।’

সোনালি আঁশের জেলা নড়াইলে তাই পাটের গল্প এখন শুধু আঁশে সীমাবদ্ধ নয়। একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা পাটকাঠিও ধীরে ধীরে কৃষকের অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে। মাঠের সেই ‘ফেলনা’ কাঠি আজ জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী ও শিল্পের কাঁচামাল-সব মিলিয়ে কৃষকের হাতে তুলে দিচ্ছে বাড়তি আয়ের নতুন সম্ভাবনা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)