রাসেল মাহমুদ
, যশোর
‘...চণ্ডিদাস আর রজকিনী/ তারাই প্রেমের শিরোমণি গো...
ও সে বারো বছর বড়শি বাইলো, বারো বছর...
তবু আদার দিলো না দরদী...’ জনপ্রিয় এই লোকসঙ্গীতে চণ্ডিদাস-রজকিনীর অমর প্রেমকাহিনির কিয়দংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে।
কথিত আছে, চণ্ডীদাস বারো বছর ধরে পানিশূন্য পুকুরে ছিপ বড়শি পেতে বসে আছেন, কিন্তু বড়শিতে আদার দেন না। অন্যদিকে, বারো বছর ধরে রজকিনী পুকুর ঘাটে আসেন, কাপড় কাচেন, জল তোলেন, চণ্ডীদাসের দিকে ফিরেও তাকান না। চণ্ডীদাস বসে আছেন অসীম ধৈর্যে, এদিকে পুকুরের পানি শুকিয়ে মাটি চৌচির হয়ে গেছে - সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার একটাই অপেক্ষা, কখন রজকিনী আসবে পুকুর ঘাটে- জল নিতে! এদিকে রজকিনীও পানিশূন্য পুকুরের জল নিতে আসে অদৃশ্য এক নেশায়। একদিন রজকিনীর মনে দয়া হলো, কিংবা নিতান্তই কৌতূহলবশত জিজ্ঞাস করলেন, ‘মাছ দুই একটা পাইলা ঠাকুর?’
চণ্ডীদাস উত্তর দিলেন, ‘দীর্ঘ ১২ বছরে এইমাত্র ঠোকর দিলো!’
চণ্ডীদাস আর রজকিনীর অমর প্রেমকাহিনীর কথা আমরা মোটামুটি সবাই জানি। এই চণ্ডীদাস আর রজকিনীর প্রেমকাহিনি শুরু হয়েছিল মাগুরা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে শালিখা উপজেলার শতখালি ইউনিয়নের ধোপাখালী গ্রামে।
কিন্তু জেলার ইতিহাস ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সেই ঘাটটি আজ অস্তিত্বহীন।
লোককথা অনুযায়ী, মধ্যযুগীয় কবি চণ্ডীদাস ও রজকিনীর প্রেমকাহিনির স্মৃতিবহনকারী এই ঘাটটি ছিল মাগুরার চিত্রা নদীর শাখা, ব্যাঙ নদীর তীরে। কালের বিবর্তনে ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় এখন সেই ঐতিহাসিক ঘাটের কোনো সুস্পষ্ট চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।
সীমাখালী-শতখালী এলাকার ধোপাপাড়া অংশে ব্যাঙ নদীর তীর ঘুরে দেখা যায়, একসময়ের প্রবাহমান নদীটি বর্তমানে মৃতপ্রায়। নদীর বিভিন্ন অংশ পাট পচানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নদীটি অনেক স্থানে সংকীর্ণ খালে রূপ নিয়েছে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধ ও নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। চারপাশের দৃশ্য দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে, এ স্থানটি বাংলা সাহিত্য ও লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ঘাটটির কোনো নামফলক বা স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন ছিল না। ফলে বাইরের মানুষের পক্ষে তো বটেই, নতুন প্রজন্মের কাছেও স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ক্রমেই বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী রজিবুল ইসলাম নিজ উদ্যোগে চণ্ডীদাস-রজকিনীর ঘাটের পথে একটি ছোট সাইনবোর্ড স্থাপন করেছেন। তবে, ওই সাইনবোর্ড ছাড়া ঐতিহাসিক স্থানটির অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য বা নির্দেশনা নেই।
কথা হয় ধোপাপাড়ার ব্যাঙ নদীর তীরের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা উকিল আলী মোল্যার সাথে। তিনি বলেন, এখানে চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতির কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। কালের বিবর্তনে সব হারিয়ে গেছে। একসময় নদীর এই অংশ ব্যক্তি দখলে ছিল। সেখানে মাছ চাষ করা হতো। দীর্ঘদিনের দখল ও অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে ঘাটটির অস্তিত্বও মুছে গেছে। এলাকাবাসীর আন্দোলন ও দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর নদীর ওই অংশ সম্প্রতি দখলমুক্ত হয়েছে। এখন সরকারিভাবে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে ভালো হবে।
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রচেষ্টার পর নদীটির দখলমুক্ত হলেও ঐতিহাসিক ঘাটটির সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করার মতো কোনো দৃশ্যমান নিদর্শনও নেই।
ইন্দ্রজিৎ আচার্য নামে এক ব্যক্তির বসতবাড়ির নিচের দিকে নদী তীরেই ছিল ঘাটটির অবস্থান- স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, লোকমুখে প্রচলিত ঐতিহ্য ও স্মৃতিকথার ভিত্তিতে এ স্থানটিকে চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত ঘাট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত করা হলেও কোনো সরকারি তথ্যফলক বা আনুষ্ঠানিক সংরক্ষণ না থাকায় এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।
তারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক স্থান। নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানটিকে পরিচিত করে তুলতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।