সম্পাদকীয়
সরকারি অর্থে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয় মানুষের কল্যাণে। বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশজুড়ে এখন খাল খনন/পুনর্খনন চলছে। পাশাপাশি এখন চলছে গাছ লাগানোর মওসুম। সরকার ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগকে অবশ্যই জনকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কিন্তু যশোরের মণিরামপুরে দুটি খাল পুনর্খননের পর বৃক্ষরোপণ প্রকল্প নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা স্বস্তিদায়ক নয়। অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু অর্থ অপচয় নয়, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিরও গুরুতর ব্যর্থতা।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মশ্মিমনগর ও মোবারকপুর খালের তীরে ১৪০টি চারা রোপণের জন্য ৭০ হাজার ১৯৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি চারার রোপণ ও পরিচর্যায় গড়ে ৫০১ টাকার বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। অথচ উপজেলা বন বিভাগে একই ধরনের চারা মাত্র নয় টাকায় পাওয়া যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর চেয়েও বিস্ময়কর, সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদক কয়েকটি চারার খাঁচা, নেট ও বাঁশের খুঁটির অস্তিত্ব পাননি। কোথাও পাওয়া গেছে মৃত চারা, কোথাও নিম্নমানের চারা।
এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সরকারি অর্থে যে কাজের হিসাব দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার কতটুকু হয়েছে? একটি চারার পেছনে ৫০১ টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী? চারা, খাঁচা, নেট, বাঁশের খুঁটি, পরিবহন ও পরিচর্যার নামে যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে, তা কি যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও রয়েছে অসঙ্গতি। প্রকল্পের সভাপতিরা বলেছেন, পিআইও দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার হোসেনই চারা কেনা থেকে শুরু করে রোপণের সব কাজ করেছেন; তারা শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেছেন। অন্যদিকে সরোয়ার হোসেন চারা কেনার দায় দিয়েছেন পিআইও সেলিম খানের ওপর। আবার পিআইওর বক্তব্য, চারা কেনা ও রোপণের কাজ করেছেন প্রকল্পের সভাপতিরাই, সরোয়ার শুধু সহযোগিতা করেছেন। অর্থাৎ দায়িত্বপ্রাপ্তদের বক্তব্যেই স্পষ্ট হচ্ছে, ঘাপলা আছে এবং তার দায় কেউ নিতে চান না।
একটি সরকারি প্রকল্পে দায়িত্ব কার- এটি অস্পষ্ট থাকার কোনো সুযোগ নেই। ফলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো পথ নেই।
প্রতিবেদনে সরোয়ার হোসেনের সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পিআইও দপ্তরে কাজ করে যাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তিনি কোন কর্তৃত্ববলে দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত আছেন, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সরকারি দপ্তরে নিয়মিত পদে না থেকেও যদি কেউ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকেন, তাহলে তার ভূমিকা ও দায়িত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
আমরা মনে করি, এ ঘটনায় শুধু দপ্তরের ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। চারা কেনার বিল-ভাউচার, সরবরাহকারী, ক্রয়মূল্য, রোপণ করা চারার সংখ্যা, খাঁচা-নেট-বাঁশের প্রকৃত পরিমাণ এবং পরিচর্যার অর্থ- সবকিছু যাচাই করতে হবে। সরেজমিন তদন্তের পাশাপাশি প্রকল্পের কাগজপত্রও খতিয়ে দেখা জরুরি।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
সরকারি অর্থ প্রকৃতপক্ষে জনগণেরই অর্থ। একটি চারার দাম কয়েক টাকা বেশি বা কম, বিষয়টি শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, জনগণের অর্থে নেওয়া প্রকল্পের প্রতিটি টাকা জনস্বার্থে ব্যয় হয়েছে কি না। আমরা আশা করবো, কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেবেন।