সম্পাদকীয়
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়; এটি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র। সেখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিখবে শৃঙ্খলা, মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সম্মান। অথচ যশোর সদরের সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা শুধু একটি বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এটি শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি ও জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পাপিয়া পারভীনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অসদাচরণ, স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং অশোভন আচরণসহ নানা অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠনের পর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পেয়েছে বলে জানিয়েছে।
অবশ্যই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্যও জানা জরুরি। তবে প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বিষয়টি আর ফেলে রাখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন নিরপেক্ষ, দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একজন শিক্ষকের আচরণের অভিযোগটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ‘তোদের দেখলে আমার ঘেন্না করে’- এ ধরনের বক্তব্য সত্যিই যদি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলা হয়ে থাকে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অভিভাবক। তার কাছ থেকে অপমান বা ভয় নয়, বরং শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণই প্রত্যাশিত।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভাঙচুরের ঘটনাও সমর্থনযোগ্য নয়। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিদ্যালয়ের কার্যালয় বা সম্পদ নষ্ট করে দাবি আদায় করার পথ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর বৈধ পথ রয়েছে এবং সেই পথ কার্যকর করাই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবহারে অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা কোনো ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের ইঙ্গিত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আগেও যদি অভিযোগ করা হয়ে থাকে, তাহলে এতদিনেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব এবং অভিযোগ অসত্য হলে তা খারিজ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা- দুটিই প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিচয়।
সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। সেখানে শিক্ষার্থীসংখ্যা ও পরীক্ষার ফলাফলের অবনতির বিষয়টিও নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হলে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীদের। তাই শুধু প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অভিযোগের নিষ্পত্তিই নয়, বিদ্যালয়ের সামগ্রিক প্রশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংকটের দ্রুত ও স্বচ্ছ সমাধান জরুরি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কোনো রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক প্রভাব যেন তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্তৃত্ব নয়, চাই নেতৃত্ব; ভয় নয়, চাই শ্রদ্ধা; গোপনীয়তা নয়, চাই স্বচ্ছতা; প্রভাব নয়, চাই জবাবদিহি। সাড়াপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সেই পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।