সুবর্ণভূমি ডেস্ক
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের এক শ্রেণির পলাতক বা ক্ষমতাচ্যুত সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণি এবং তাদের বিলাসিতানির্ভর জীবনযাত্রাকে ব্যঙ্গ করে লিখেছেন খ্যাতনামা সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক এবং রাজনৈতিক স্যাটায়ারিস্ট মাসকাওয়াথ আহসান। তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে প্রকাশিত লেখাটি সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
দৈনিক খরচা দুঃসংবাদ দেয়, চব্বিশের পরে অনেকেই হারমোনিয়াম ফেরত দিয়া গেছে।
খবরটা দেখেই দৈনিক হিরোশিমার সম্পাদক চিফ রিপোর্টারকে ডেকে বলেন, খবর রাখো মিয়া! যাও রিপোর্টার পাঠাইয়া খোঁজ নাও; চব্বিশের পর লোকজন কি কি ফেরত দিয়া গেছে; আর কি কি কিইনা নিয়া গেছে!
রিপোর্টার বাজারে বেরিয়ে পড়ে। রোলেক্স ঘড়ি বিক্রির আউটলেটে গিয়ে দেখে মাছি উড়ছে। একটা লোক বসে ঝিমাচ্ছে সেখানে। রিপোর্টার জিজ্ঞেস করে, কি ভাই বেচাবিক্রি নাই!
--বেচাবিক্রি থাকবো কেমনে! শহরের রুচিশীল লোকেরা চব্বিশের পর ভাইগা গেছে গিয়া। এখন শুধু রুচির দুর্ভিক্ষ। রোলেক্স ঘড়ি কিনার মুরোদ আছে নাকি কারো!
--কেন ঘুষ-চাঁদাবাজি কি বন্ধ হয়ে গেছে!
--ঘুষ-চাঁদাবাজির টাকা দিয়া বড় জোর কফি এনিমা খাওন যায়। রোলেক্স ঘড়ি কিনতে মেগা প্রকল্পের কমিশন লাগে। যেই সরকারের কর্তা ব্যক্তি দুপুরে ছোট চিংড়ি দিয়া লাউয়ের তরকারি খান; ঐখানে মেগা প্রকল্প আইবো কই থিকা।
--নেপো বেবিরা একটা দুইটা বড় প্রকল্প পাইছে; অপেক্ষা করেন, ঠিকই রোলেক্স ঘড়ি কিনতে আইবো নেপো বেবি আর তাগো বেবি সিটাররা।
রিপোর্টার এবার পাশের দোকানে যায়। সেখানে পরচুলা বিক্রি হয়। একটা লোক সেখানে পরচুলা খুলে নিজেকে বাতাস দিচ্ছে!
--কি ভাই কারেন্ট নাই!
--টুক কইরা আহে, টুক কইরা চইলা যায়।
--আজকাল আর উইগ বিক্রি হয় না!
--চব্বিশের পর সুদৃশ্য টাকের লোকগুলি ইন্ডিয়া চইলা গেছে; আর ঝাঁটার খিলের মতো চুলের মাইয়াগুলি ওয়েস্ট ইনে ঘোরাঘুরি বাদ দিয়া ফেসবুকের রুদালি হইছে। বাঁচন আর নাইগো ভাই। না খাইয়া মরতেছি।
জীবনটা কিছু নয় শুধু একমুঠো ধুলো।
পালা শেষ হলে পরে
পড়ে থাকে সাজ ঘরে
জরির মুকুট আর
মেকি পরচুলো!
রিপোর্টার এবার পাশের মেক আপ-পারফিউমের দোকানে যায়। দোকানি হা করে ঘুমাচ্ছে। সেলস গার্ল বসে টিকটক দেখছে আর খুনখুন করে হাসছে। রিপোর্টার জিজ্ঞেস করে, কি বিক্রিবাট্টা নাই!
--চব্বিশের পর মেক আপ-পারফিউম কিনবে কে! ইশকুল খুইলাছে মওলা গাইতো যারা; সেই গাঢ় মেক আপ চড়া লিপস্টিক আপারা দেখি চটা পড়া চেহারা নিয়া কলকাতায় বাদাম খাইতেছে।
এসময় এক আপা ময়ূরের মতো পেখম মেলে শো রুমে প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, টিপ দেখান তো; ইউনুসের আমলে টিপ দিতে ভয় লাগতো; তারেকের আমলে সেই ভয় নেই!
রিপোর্টার বলে, আপা এই কথাটা কি আমি দৈনিক হিরোশিমার রিপোর্টে উল্লেখ করতে পারি। কে জানে এটা পড়ে কেউ আপনাকে তথ্য কমিশনার পদে নিয়োগ দিতে পারে।
--আপনি কি জানেন প্রতিবাদ ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে এমবের্তো একো, মিশেল ফুঁকো প্রমুখ কি বলেছেন!
রিপোর্টার ভয় পেয়ে পাশের বাদ্যযন্ত্রের দোকানে যায়। সেখানে এক শীর্ণকায়া লোক বসে হারমোনিয়ামে টিউনিং করছে। রিপোর্টার কথা বলতে গেলে লোকটা ইশারা করে। তারপর আলতো করে বলে, দুইজন রিপোর্টার এর আগে আইসা খোঁজ নিয়া গেছে; আপনে দিয়া তৃতীয়জন।
--চব্বিশের পর সবাই হারমোনিয়াম ফেরত দিয়া গেছে শুনলাম!
--দাঁড়ান ৪৪০ হার্টজরে ৪৩২ হার্টজ কইরা নিই। লোকজন ফেসবুক থিকা হার্টজের হিসাব শিখছে নতুন নতুন। টিউনিং চেঞ্জ করতে দিয়া গেছে বেশ কয়েকজন।
--হারমোনিয়াম ফেরত দিলো কারা!
--যেই দেশে ওস্তাদ হারুন, ওস্তাদ বিপ্লব, ওস্তাদ শামীম ওসমান নাই; সেই দেশে গানের কদর আর কে করবে ভাই!
রিপোর্টার ক্লান্ত হয়ে একটা কফিশপে যায়। জিজ্ঞেস করে, কি ভাই এতো খালি খালি লাগে কেন!
--ক্যান আপনি কি দেখেন নাই! এক ব্যর্থ প্রেমিক উকিল নোটিশ দিছে, নাটক-সিনেমায় বেশি প্রেম দেখানো যাবে না! চব্বিশের পর প্রেমিকেরা সব ইন্ডিয়া চইলা গেছে। রইয়া গেছে খালি বিরহ। যাও একটু প্রেম উঁকি দিতো; এই উকিল নোটিশের পর সেইটাও শুকায়া গেছে।
রিপোর্টার চিফ রিপোর্টারকে ফোন করে পরিস্থিতির ঘনঘটা সম্পর্কে জানায়। চিফ রিপোর্টার বলে, একজন বুদ্ধিজীবীর সমাজ বিশ্লেষণ জোগাড় করো। তাইলে ব্যাপারটা কমপ্লিট হয়।
বুদ্ধিজীবীর কথা উঠতেই এক ডক্টোরাল ফেলো গরমের মধ্যে ব্লেজার পরে কফি শপে ঢোকে। রিপোর্টার তাকে এপ্রোচ করলে; বুদ্ধিজীবী বলে দাঁড়ান, আমার এপয়েনমেন্ট ডায়েরিটা দেখে নিই।
ফোনে ডিজিটাল ডায়েরিতে চোখ বুলিয়ে বলে, আপনাকে জাস্ট বিশ মিনিট দিতে পারবো। এরপর একটা টকশো আছে।
রিপোর্টার দ্রুত তার রিপোর্টের বিষয় সম্পর্কে বলতে শুরু করে। কিছুক্ষণ শুনে ডক্টোরাল ফেলো বলে, আসলে বিকাশমান রুলিং এলিটেরা চব্বিশের পরে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায়; বাজারে এই তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। সাব অল্টার্ন তো সূর্য দেখে সময় অনুমান করে; ফলে তার রোলেক্স ঘড়ি দরকার নেই। পরচুলা প্রয়োজন হয় এলিটের। আপনি কখনো টাকমাথা সাব অল্টার্ন দেখেছেন কি! দেখেননি তাই না! আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত রিকনসাইল করে টাকাওয়ালা লোকেদের রাজনীতিতে না ফেরাবেন; ততক্ষণ ফাইভ স্টার হোটেলে-সেনাকুঞ্জে বিয়ের সংখ্যা কম হবে। ফলে মেক আপ প্রয়োজন হবে না। ফ্রাংকফুর্ট স্কুল অফ থট ঠিক এই কারণে যে কোন মুল্যে বিগ ফিশদের পুনর্বাসনের কথা বলেছে। আগামবেনই কি বলেননি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের কথা!
--স্যার যদি একটু হারমোনিয়াম সম্পর্কে বলেন!
--দিল্লি প্যাক্ট বাদ দিয়ে আপনি মক্কা প্যাক্টের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করলে হারমোনিয়াম বিক্রি হবে কি করে। বাজারে শুধু খেজুর, মিসওয়াক, টুপি, সুরমা, আতর বিক্রি হবে। টিপ বিক্রি কমে হিজাব বিক্রি বাড়বে! এজরা পাউন্ড এ কারণে বলেছিলেন, মুসোলিনিকে যে তাড়ালে; এখন বাজারে সাদা টেলিফোন, সাদা গাউন, সাদা হাই হিল স্যান্ডেল বিক্রি কমে; নান'দের আজানুলম্বিত পোশাকের বিক্রি বাড়বে। সোফিয়া লরেন এ কারণেই বলেছিলেন, সাজানো গোছানো ইটালিটাকে তোমরা শেষ করে দিলে।
--সোফিয়া লরেন তো মুসোলিনির শ্যালিকা ছিলেন বোধ হয়!
--তাতে কি, রুলিং এলিটের মাঝে বেয়াই, ভাগ্নে, শ্যালক, শ্যালিকা থাকতেই পারে। সাব অল্টার্নদের মতো তো তারা টোকাই নয়।
--স্যার, গবেষণা গ্রন্থে পড়েছি, আফ্রিকা, পারস্য, মধ্য এশিয়া আর দূর প্রাচ্যের লোকেরা এসে বসতি গড়েছিলো দক্ষিণ এশিয়ায়। এর মধ্যে আফ্রিকীয় বংশোদ্ভুতরা নিজেদের এলিট দাবি করে লোকজনকে ঘন ঘন সাব অল্টার্ন বলে! আপনি কি ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন স্যার!
--আজ আর আপনাকে সময় দিতে পারবো না ভাই। টকশো প্রোডিউসার তাড়া দিচ্ছেন।
[সংযুক্ত ছবিটি এ আই দিয়ে তৈরি]