আনোয়ার হোসেন
, মণিরামপুর
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে কর্মস্থল থেকে বিতাড়িত হন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ।
এরপর দুই বছরের বেশি সময় ধরে তিনি কলেজে ফিরতে পারেননি। সর্বশেষ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) হঠাৎ কলেজে গিয়ে নিজ চেয়ারে বসেন তিনি। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ২০ থেকে ৩০ জন বহিরাগত এসে তাকে কলেজ থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করেছেন অধ্যক্ষ। পরে তার কক্ষে তালা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঘটনাটি রোববার দুপুরের হলেও বিষয়টি জানাজানি হয় সন্ধ্যার পর।
কলেজের একটি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে স্থানীয়দের তীব্র আন্দোলনের মুখে অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তৎকালীন সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির হোসেন তার স্থলে কলেজের শিক্ষক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। এরপর থেকে আব্দুল লতিফ কলেজে না গিয়ে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন।
সম্প্রতি কলেজের ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি অফিস সহায়কের একটি পদও শূন্য হবে। অধ্যক্ষ পদে স্থায়ী কেউ থাকলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের সুযোগ না থাকায় এসব নিয়োগ সম্পন্ন করতে আব্দুল লতিফকে কলেজে ফেরানোর চেষ্টা চলছে বলে সূত্রটি জানায়।
অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ বলেন, ‘‘গত ফেব্রুয়ারি মাসে আমি সভাপতির সঙ্গে দেখা করে কলেজে ফেরার আবেদন করি। এর সাত মাস পর গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনি আমাকে একটি চিঠি দেন। সেখানে বলা হয়েছে, কলেজে ফেরা বা না ফেরা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। সভাপতির ‘আপত্তি না থাকায়’ রোববার সকাল ৯টার দিকে কলেজে যাই। শিক্ষকদের চিঠিটি দেখিয়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসি।’’
‘‘বেলা ১২টার দিকে ২০ থেকে ৩০ জন অপরিচিত লোক কলেজে এসে আমাকে বের করে দেয়। বিষয়টি ফোনে সভাপতিকে জানালে তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে পরামর্শ না করে আপনি এভাবে কলেজে যাবেন কেন?’ এরপর আমি চলে আসি। কলেজের কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেননি,’ বলেন অধ্যক্ষ।
তিনি আরও বলেন, ‘‘কলেজে যাওয়ার আগে রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘যেহেতু আপনার কাছে চিঠি আছে, আপনি কলেজে থাকেন।’ পরে লোকজন আসার পর তাকে ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।’’
তবে অধ্যক্ষের দাবির বিষয়ে রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক কামাল হোসেন বলেন, ‘অধ্যক্ষ একবার ফোন করেছিলেন। তবে এসব বিষয়ে তার সঙ্গে আমার কথা হয়নি। তাছাড়া গতকাল আমি স্টেশনে ছিলাম না, আদালতে কাজ ছিল। কলেজে অধ্যক্ষকে লাঞ্ছিত করার বিষয়ে কেউ আমাকে জানায়নি। এ ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগও করেনি।’
এদিকে রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মঈনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের একটি চিঠি পাওয়া গেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘গত ৪ মার্চ ২০২৬ আপনার পত্রের মাধ্যমে জানতে পারি, আপনি বর্তমান অধ্যক্ষ পদে যোগদানের আবেদন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভা হয়েছে। সভায় জানতে পেরেছি, আপনি ২৯ আগস্ট ২০২৪ তারিখ থেকে অনিয়মিত ছুটি ভোগ করছেন। আপনার বিরুদ্ধে কয়েকটি ফৌজদারি মামলা আছে। এমন অবস্থায় আপনার যোগদান করা বা না করা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়।’
মামলার বিষয়ে অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ বলেন, ‘২০২৪ সালে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় আমার নামে একটি মামলা হয়েছে বলে শুনেছি। এ ছাড়া আর কোনো মামলা আছে কি না, জানি না।’
কলেজে নতুন নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শুনেছি নিয়োগ হবে। আমাকে কেউ বিস্তারিত জানায়নি।’
রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘রোববার সকালে কলেজে পৌঁছানোর আগেই শুনি, তিনি আমার চেয়ারে বসে আছেন। এরপর আমি কলেজে যাইনি। বিষয়টি সভাপতিকে ফোনে জানিয়েছি। পরে কলেজে কী হয়েছে, তা জানা নেই।’
এ বিষয়ে জানতে রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মঈনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, রাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের বিতাড়িত অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের অনুসারী ছিলেন। ব্যবসায়ী না হয়েও তিনি প্রভাব খাটিয়ে রাজগঞ্জ বাজার কমিটির শীর্ষ পদে ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ওই সময় তার কথায় রাজগঞ্জ বাজার ও কলেজ পরিচালিত হতো এবং তিনি স্থানীয়দের গুরুত্ব দিতেন না বলে সূত্রগুলোর দাবি। এ কারণে তিনি স্থানীয়দের রোষানলে পড়েন।
কলেজের একটি সূত্র জানায়, অধ্যক্ষ আব্দুল লতিফ একক সিদ্ধান্তে কলেজ পরিচালনা করলেও সে সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশি। তিনি চলে যাওয়ার পর কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়ে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই কম। সব মিলিয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত হয় না।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুজিবুর রহমানও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ২০২৪ সালের পর থেকে কলেজের এমন অবস্থা। এ ধরনের পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। তবে পরীক্ষার সময় সবাই উপস্থিত থাকে।