সম্পাদকীয়
স্বপ্ন থেকে দুর্গন্ধময় বাস্তবতা
বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়ে যশোরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণ করা হয়েছিল, আট বছর পর সেটি যেন অব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত উদাহরণে পরিণত হয়েছে। প্লান্টটি থেকে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল; বাস্তবে সেখানে জমেছে বর্জ্যের পাহাড়, ছড়াচ্ছে পচা দুর্গন্ধ, গড়িয়ে পড়ছে দূষিত পানি। জনগণের অর্থে নির্মিত এই বড় প্রকল্প যদি শেষ পর্যন্ত দুর্ভোগের কারণ হয়, তাহলে সেটিকে সাফল্য বলার সুযোগ থাকে না।
প্রশ্নটি তাই সরাসরি করতে হয়—৫০ কোটি টাকা খরচ করে এমন একটি প্রকল্প করা হলো কেন, যদি সেটিকে কার্যকর রাখার মতো প্রযুক্তি ও অবকাঠামোই নিশ্চিত করা না হয়ে থাকে?
২০১৮ সালে প্রকল্পটি চালুর পর আট বছর পার হয়েছে। অথচ প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন বর্জ্য সেখানে নেওয়া হলেও প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। বাকি বর্জ্য পড়ে থাকছে খোলা জায়গায়। অর্থাৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে কার্যত একটি বিশাল ময়লার স্তূপ তৈরি হয়েছে। বর্ষায় সেই বর্জ্য থেকে দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের এলাকায়। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ মানুষ, ঝুঁকিতে শিক্ষার্থী ও পথচারী। তাহলে এই প্রকল্পের সাফল্য কোথায়?
আরও হতাশাজনক তথ্য হলো, চালুর পর থেকে প্রকল্প থেকে পৌরসভার আয় হয়েছে মাত্র ১৫ লাখ টাকা। যে প্রকল্প থেকে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার প্রত্যাশা ছিল, সেটিই এখন পরিবেশের জন্য হুমকি। বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনও বন্ধ। সীমিত পরিসরে জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে মাত্র।
পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আধুনিক সেগ্রিগেশন মেশিন না থাকায় শতভাগ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রয়েছে গ্যাসের স্বল্পতা ও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামোগত সমস্যা। এসব বক্তব্য সত্য হলে আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে—প্রকল্প গ্রহণের আগে এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি কেন?
একটি প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তি নির্বাচন ও বাস্তবায়নে ভুল হতে পারে। কিন্তু সেই ভুল শনাক্ত হওয়ার পরও বছরের পর বছর তা সংশোধন না করা অব্যবস্থাপনারই নামান্তর। ফ্যাসিবাদী আমলে নির্মিত বহু প্রকল্প যেমন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, এটিও তার একটি উদাহরণ ছাড়া কিছুই নয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো জনস্বাস্থ্য। প্লান্টের আশপাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, বসতি রয়েছে। পচা বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও দূষিত পানি যদি মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টি করে, শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচল ও পড়াশোনায় বাধা দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানুষের জীবনকে নিরাপদ করার কথা; মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করার নয়।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী প্লান্ট পরিদর্শন করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং ব্যর্থতার কারণ খুঁজে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু আমরা অতীতে এমন বহু প্রকল্পের ক্ষেত্রে দেখেছি—পরিদর্শন হয়, কমিটি হয়, আশ্বাস আসে; তারপর সবকিছু আগের জায়গায় ফিরে যায়। যশোরের এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এখন প্রয়োজন লোকদেখানো তৎপরতা নয়, কঠোর সিদ্ধান্ত। প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক নিরীক্ষা করতে হবে। কোথায় ভুল হয়েছে, কার সিদ্ধান্তে হয়েছে, কত টাকা অকারণে ব্যয় হয়েছে এবং কার অবহেলায় প্রকল্পটি পূর্ণ সক্ষমতায় যেতে পারেনি—সবকিছু প্রকাশ্যে আনতে হবে। অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে দ্রুত আধুনিক বর্জ্য পৃথককরণ ব্যবস্থা চালু, দূষিত পানি শোধন ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ এবং বায়োগ্যাস-বিদ্যুৎ উৎপাদন পুনরায় চালুর বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রযুক্তি ও পরিচালন কাঠামো নতুন করে সাজাতে হবে।
বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, সেটি এখন বাস্তবে ফিরিয়ে আনা হোক। আর সেই স্বপ্নের নামে যদি কারও অবহেলা, অদক্ষতা বা অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে তারও হিসাব নেওয়া হোক।