বিশ্বাস ওয়াহিদুজ্জামান
মানুষকে সজাগ সচেতন করে তুলতে সারাবছর নানা দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে পালিত দিবসগুলি ৩ ভাগে বিভক্ত- ১. জাতীয় দিবস ২. আন্তর্জাতিক দিবস ৩. বিশ্ব দিবস। জাতীয় দিবসগুলি নির্ধারণ করে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আর আন্তর্জাতিক দিবস ও বিশ্ব দিবসগুলি নির্ধারণ করে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো।
আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এ দিবস উদযাপনে বাংলাদেশে ফোকাল পয়েন্ট মন্ত্রণালয় হচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর সাচিবিক কাজ করে এ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, যার প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ে।
নিকট অতীতে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সাক্ষরতা বৃদ্ধির নানা প্রচেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমন-
১. উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো প্রতিষ্ঠা; ২. উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর অফিস স্থাপন; ৩. এনজিওবিষয়ক ব্যুরো নিবন্ধিত এনজিওগুলোকে শত শত কোটি টাকা সরকারি অনুদান দিয়ে সাক্ষরতা বৃদ্ধির কাজ করানো; ৪. ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদভিত্তিক গণসাক্ষরতা কর্মসূচি; ৫. হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত মন্দিরভিত্তিক গণসাক্ষরতা কর্মসূচি; ৬. উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ১৯৯০ হতে ১৯৯৭ পর্যন্ত সার্বিক সাক্ষরতা (টিএলএম) কর্মসূচিতে জেলাভিত্তিক নামকরণ করা যেমন ‘বিকশিত মাগুরা’, ‘উদ্ভাসিত ঝিনাইদহ’, ‘আলোকিত বরিশাল’। এর মাধ্যমে সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে মাগুরাকে ও পরে আরও কিছু জেলাকে নিরক্ষরতামুক্ত জেলা ঘোষণা করা হয়।
এসব প্রচেষ্টা নিতান্ত মাঠে মারা যায়নি। কিছু কাজ হয়েছে বটে। কিন্তু তৎপরবর্তীতে নতুন করে নিরক্ষরতা সৃষ্টি হচ্ছে। সে কালের নব্য সাক্ষরগণ ভুলে যাচ্ছেন সাক্ষরতা তথা জীবনঘনিষ্ঠ কিছু পড়া-লেখা, যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ বা হিসাব করা, হিসাব লিখে রাখা, সাইনবোর্ড পড়া, ভাউচার পড়া ও লিখতে পারা। আবার নতুন প্রজন্মের একটি অংশ স্কুল-মাদরাসা হতে ঝরে যাচ্ছে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে না বা হলেও টিকছে না। বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং বা ধর্ষণের শিকার হয়ে বা ভয়ে স্কুল-মাদরাসায় যাচ্ছে না অনেক মেয়ে। হালে শুরু হয়েছে যেখানে সেখানে কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা। এটিও নিরক্ষর জাতি গঠনে একটি মরণ ফাঁদ।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসি।
ব্যালটে প্রার্থীর মার্কা নয়, নাম
বলা যায় বাংলাদেশ ভোটের দেশ, মোটা ভাত মোটা কাপড়ের দেশ। যেমন ধরুন ইউনিয়ন ভোট, উপজেলার ভোট, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এছাড়াও আছে জেলা পরিষদ ভোট, এটি আবশ্য পরোক্ষ নির্বাচন বা বেসিক ডেমোক্রেসি। এছাড়া সারাবছর আমরা দেখি শ্রমিক ইউনিয়ন, বাজার সমিতির, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বণিক সমিতি, ভ্যানচালক, রিকশাচালক, ইজিবাইক সমিতি, আইনজীবী সমিতি, অফিসার্স ক্লাব, পাঠাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি বা রাজনৈতিক দলের কমিটি গঠন নির্বাচন। সব মিলে নির্বাচন দেখে দেখে আমরা বেশ আনন্দিত, পুলকিত ও সমৃদ্ধ বটে।
কিন্তু এসব নির্বাচনের অনেকগুলোতে মার্কায় ভোটগ্রহণ হয়। এতে ব্যালট পেপার পড়ার দরকার হয় না মোটেই। মার্কা দেখেই মার্কিং সিল মারা হয়। ফলে পড়াশুনার কোনো প্রয়োজন হচ্ছে না এখানে। এছাড়া ব্যালট পেপারের মুড়িতেও স্বাক্ষরের পরিবর্তে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল ভোটারের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের ছাপ দেওয়ার একটি কমন প্রথা দেশে রয়েছে। যদিও দেশে শিক্ষিত ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়।
এক্ষেত্রে মহামূল্যবান এই ব্যালট পেপারে ছবির পরিবর্তে শুধু মোটা অক্ষরে প্রার্থীদের নাম-ঠিকানা রাখার সুপারিশ করছি। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ভাবতে ও পাইলটিং করতে বিনীত অনুরোধ করছি। এতে ভোটাররা পড়া শিখবেন পাঁচ বছর ধরে। আমাদের দেশের লক্ষ-কোটি রাজনৈতিক কর্মী ও যুব-কিশোররা নিজ নিজ পাড়া-মহল্লা-গ্রামে নিরক্ষরদের সাক্ষর করে তুলবেন। গ্রামে গ্রামে নাইট স্কুল তৈরি হবে। এটি একটি অনুকরণীয় কাজ হতে পারে। বিনা বা স্বল্পতম সরকারি খরচে এগুলি করা সম্ভব। সর্বাধিক সাক্ষরতা দানকারী যুবককে ইউনিয়ন/পৌরসভা/উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস বা বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পুরস্কার ও সনদ দেওয়া হবে।
সাক্ষরতা দান ধারাবাহিক মূল্যায়ন
এছাড়াও এসএসসি/দাখিল হতে মাস্টার্স পর্যন্ত ৫০ মার্কের সাক্ষরতা দান নামে একটি ধারাবাহিক মূল্যায়ন বিষয় রাখা যায়। যেখানে দুই বছরে শিক্ষার্থীরা তার চারপাশে কমপক্ষে ১০ হতে ২০ জনকে সারাবছর সুবিধামতো সাক্ষরতা দান করে একটি প্রাকটিক্যাল খাতায় দিন-তারিখভিত্তিক বিবরণ লিখেবেন। পরে সাক্ষরজ্ঞান অর্জনকারী ব্যক্তির নিজ হাতের লেখা ও অভিব্যক্তি থাকবে। এভাবে দেশে একটি গুড কালচার শুরু হবে। এবিষয়ে এনসিটিবি একটি নীতিমালা/গাইডলাইন তৈরি করবে।
এগুলো ছাড়াও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা পাবো একটি সাক্ষর, উন্নত ও জ্ঞাননির্ভর জাতি।
লেখক: শিক্ষাকর্মী
*মতামত লেখকের নিজস্ব