যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন, ঢালাও অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের যৌন হয়রানি

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন, ঢালাও অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য

ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের মধ্যে নীতি, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আত্মসংযমের বোধ জাগ্রত করার কথা। বিশেষ করে মাদরাসা ও হেফজখানায় অভিভাবকেরা সন্তানকে পাঠান এই বিশ্বাসে যে, সেখানে তারা ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র ও মূল্যবোধের শিক্ষা পাবে। কিন্তু সেখানে যখন কোনো শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে, তখন তা শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ হয়ে থাকে না বরং সমাজে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে।

নড়াইলের ডুমুরতলা এলাকার তাফসীর উদ্দিন হাফেজিয়া মাদরাসার ছয় শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তারের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সুবর্ণভূমির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক শিশুর অভিযোগের পর আরও পাঁচ শিশু একই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক মাদরাসা থেকে চলে যাওয়ার পর পুলিশ তাকে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনগতভাবে অপরাধী বলা যাবে না। তবে একাধিক শিশুর অভিযোগ ওঠার ঘটনাটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার দাবি রাখে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, শিশুরা কেন এমন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে?

কোনো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কিছু ব্যক্তির অপরাধ বা বিতর্কিত কাজ দিয়ে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কথা বলে কোনো অভিযোগকে আড়াল করাও অন্যায়কেই সমর্থন করা। ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক, পদমর্যাদা বা শিক্ষকতার অবস্থান কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না। বরং যিনি ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেন, তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তদন্ত ও জবাবদিহির প্রয়োজন আরও বেশি।

এখানে শুধু অভিযুক্ত শিক্ষক নন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি মাদরাসায় যদি অল্পসংখ্যক শিশু দীর্ঘ সময় আবাসিক পরিবেশে থাকে, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নজরদারি, একাধিক দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা জরুরি। শিশুদের সঙ্গে একান্তে থাকার সুযোগ, শারীরিক শাস্তি বা অনুপযুক্ত আচরণ—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, শিশুদের কথা বিশ্বাসযোগ্যভাবে শোনা। যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুরা অনেক সময় ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ কিংবা অপরাধীর হুমকির কারণে মুখ খুলতে পারে না। তাই কোনো শিশু অভিযোগ করলে তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া, বিষয়টি ‘প্রতিষ্ঠানের সম্মানের’ প্রশ্নে গোপন করা কিংবা আপসের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। অভিযোগের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে রেখে পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।

রাষ্ট্রেরও এখানে দায়িত্ব রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—মাদরাসা, হেফজখানা বা অন্য যেকোনো আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- শিশুদের জন্য নিরাপদ কি না, তা নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে কাজ করার উপযুক্ততা এবং অতীত আচরণ যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার। শিক্ষকদের জন্য শিশু সুরক্ষা, পেশাগত আচরণ এবং যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।

তবে এসব পদক্ষেপের অর্থ কোনোভাবেই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়। বরং এর মাধ্যমে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। কারণ একটি নিরাপদ মাদরাসা শুধু ধর্মীয় জ্ঞানই দেয় না, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকারকেও সম্মান করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা কোনো ধর্ম, মত বা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় প্রশ্ন। একটি শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন তার শৈশব, মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই অভিযোগ সত্য হলে অপরাধীর পরিচয় বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।

ধর্মীয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যদি সত্যিই নৈতিক ও চরিত্রবান মানুষ তৈরি করা হয়, তাহলে সেই শিক্ষার পরিবেশও হতে হবে নৈতিক, স্বচ্ছ ও নিরাপদ। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ কোনো অভিযোগ অস্বীকার করা নয়; বরং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

শিশুরা আমাদের আমানত। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই; ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও নয়, অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)