সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘এক দফা’ মানেই সরকার পতনের আন্দোলন। সাধারণত একটি নির্বাচিত সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর যখন জনআস্থা হারায়, প্রশাসনিক ব্যর্থতা প্রকট হয় এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হয়ে আসে, তখন বিরোধীরা এক দফার আন্দোলনে যায়। কিন্তু এবার যেন সেই রাজনৈতিক রীতিটাই উল্টে যাচ্ছে। সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ছয় মাসের কিছু বেশি সময়। এর মধ্যেই বিরোধী জোট রাজপথে দাঁড়িয়ে সরকার পতনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এত তাড়া কীসের?
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে নেতাদের বক্তব্যে বিষয়টি আর নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের পর্যায়ে নেই। বলা হয়েছে, ছয় দফা দাবি মানা না হলে তা এক দফায় রূপ নেবে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত দাবি দাঁড়াবে সরকারের পদত্যাগে। বিরোধী রাজনীতির ইতিহাসে এতো অল্প সময়ে এমন অবস্থান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।
জোটের ছয় দফার কয়েকটি দাবি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ— এসব নিয়ে সরকারের জবাবদিহি থাকা উচিত। সরকার যদি এসব সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হয়, বিরোধীরা সমালোচনা করবে, সংসদে চাপ সৃষ্টি করবে, জনগণকে সংগঠিত করবে- এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক পথ।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন এসব দাবি আদায়ের রাজনৈতিক পথ হিসেবে সরাসরি ‘সরকার পতনের দাবি’ সামনে আনা হয়।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে। বিরোধী জোট বলছে, জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছে, অতএব সেই রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে। সরকারের যুক্তি, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই; তাই সংসদীয় ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সংস্কার করতে হবে। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং আইন, সংবিধান ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
এখানে সরকারেরও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে যদি সরকার গড়িমসি করে, অস্পষ্টতা তৈরি করে কিংবা বিরোধীদের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা এড়িয়ে যায়, তাহলে রাজনৈতিক উত্তেজনার দায় সরকারও এড়াতে পারবে না। একইভাবে জনগণের দুর্ভোগ যদি বাড়তে থাকে এবং সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, বিরোধীদের আন্দোলনের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু বিরোধী জোটেরও মনে রাখা দরকার, নির্বাচনে পরাজিত বা বিরোধী অবস্থানে থাকা মানেই সরকারকে ছয় মাসের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার পাওয়া নয়। জনগণ ভোট দিয়েছে; সেই ভোটের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি নির্বাচিত সরকারকে গণতান্ত্রিকভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়াও বিরোধীদের দায়িত্ব। সরকার খারাপ করলে জনগণই তার বিচার করবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনীতির ভাষায় আবারও ‘বাধ্য করবো’, ‘প্রতিরোধ গড়ে তুলবো’, ‘এক দফায় রূপ নেবে’- এই ধরনের শব্দ ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে। বাংলাদেশ অতীতে রাজপথের সংঘাতের ভয়াবহ মূল্য দিয়েছে। নতুন করে যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিষ্ঠান থেকে সরে রাজপথের শক্তি পরীক্ষায় পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি, জনজীবন এবং গণতন্ত্র তথা সবকিছু।
সরকারকে কাজ দিয়ে আস্থা অর্জন করতে হবে। বিরোধীদের দাবি থাকলে তা যথাযথ যুক্তি দিয়ে খারিজ করতে হবে। আর গণভোটের রায় নিয়ে বিরোধ থাকলে তার সাংবিধানিক সমাধান খুঁজতে হবে।
ছয় মাসেই যদি রাজনীতির গন্তব্য ‘এক দফা’ হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন শুধু সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে নয়, প্রশ্ন উঠবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও। সরকার বদলানোর তাড়ার চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রয়োজন এখন অনেক বেশি।
সরকারের জবাবদিহি চাই, বিরোধীদের আন্দোলনের অধিকারও চাই। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে অস্থিরতা চাই না।