সম্পাদকীয়
দশ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্ন নয়; এটি একটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জনজীবনের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দেশে গ্যাসের সংকট বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই বাস্তবতায় ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর প্যানেল থেকে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। তবে বড় লক্ষ্য ঘোষণার পাশাপাশি সেটি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
রুফটপ সোলার প্যানেল বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সম্ভাবনাময়। দেশের বিপুলসংখ্যক সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনার ছাদ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো গেলে একদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকার রুফটপ সোলার থেকে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট সাড়ে দশ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে— এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সম্ভাব্য ব্যবধান থাকলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহ বাড়তে পারে। পাশাপাশি সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক ও কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
তবে এখানে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মান নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার বা ব্যাটারি ব্যবহার করলে বিনিয়োগকারীর ক্ষতির পাশাপাশি পুরো খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়ত, গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ সূর্যালোকনির্ভর হওয়ায় উৎপাদনের ওঠানামা সামাল দিতে গ্রিড ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ প্রযুক্তি ও আধুনিক পূর্বাভাসব্যবস্থা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যশোর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সোলার ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং ল্যাব উদ্বোধনের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক। শুধু প্রকল্প স্থাপন নয়, দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, ত্রুটি নির্ণয় ও আধুনিকায়নের জন্য দেশজুড়ে প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী তৈরি করতে হবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
সরকার আগামী গ্রীষ্মের আগেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য জানিয়েছে, তার বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, কতটি বাস্তবায়িত হয়েছে, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে— এসব তথ্য যথসময়ে প্রকাশ করলে জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। কিন্তু দশ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, সহজ অর্থায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ জনবল, শক্তিশালী গ্রিড এবং কার্যকর নীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবে রূপ নেবে। আমরা প্রতিশ্রুতি শুনেছি, এখন দেখতে চাই এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন। কারণ টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর।